আজঃ ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ - ১৫ই নভেম্বর ২০১৮ - রাত ১২:৪২

দৈনন্দিন জীবনে ফেসবুকের প্রভাব

Published: সেপ্টে ১৪, ২০১৮ - ২:৪৭ অপরাহ্ণ

ড. কামরুল হাসান ও ড. তুহিন রায়::ফেসবুক হলো নিজের ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তি অন্যের সামনে তুলে ধরার অবারিত খোলা মাঠ। এটি নিয়ন্ত্রণের ভার অনেকাংশে আমাদের ওপর। অবাধ তথ্যপ্রবাহের ওই যুগে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনা, তথ্য প্রকাশের অন্যতম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। বর্তমান সময়ে ফেসবুক দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে। কাউকে চেনা বা জানা এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্ব এককথা না হলেও ফেসবুকের কল্যাণে তারা বন্ধু হয়ে গেছেন। সে জন্য ‘প্রকৃত বন্ধু’ ও ‘ফেসবুক বন্ধু’র মধ্যে তফাত বোঝানোর জন্যও ‘ফেসবুক বন্ধু’ কথাটি ব্যবহার করা হয়। তবে সবাই কমবেশি কিছুক্ষণ পরপর ফেসবুক বন্ধুর সঙ্গে একটু ঘুরে আসার প্রয়োজনবোধ করেন। কখনও চাপ অনুভব করেন। কারও কাছে এটি একরকম খণ্ডকালীন চাকরির মতো। সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার না করলে ফেসবুক হয়ে উঠতে পারে অসুখী হওয়ার মুখ্য কারণ। বিশেষ করে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বশীল আচরণকে এড়িয়ে যেতে পারেন না।

‘যারা হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’, তাদের জন্য ফেসবুক এনে দিয়েছে অবারিত সুযোগ। সাইবার বিপ্লবের ফলে মানুষ সহজে তার মতামত, চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে পারছে। অনেকেই মনে করেন, আমরা এখন তথ্যযুগে প্রবেশ করেছি। তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই যুগে অনলাইনে যে সমাজ গড়ে উঠেছে, সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাস্টেল তার নাম দিয়েছেন ‘নেটওয়ার্ক সমাজ’। এই নেটওয়ার্ক সমাজের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। সে যাই হোক, সাইবার স্পেসে এখন সমাজ, রাজনীতি, ধর্মবিষয়ক মতাদর্শ প্রচার করা খুবই সহজ হয়ে গেছে। এর ফলে মূলত দুটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রটি কিছুটা গণতান্ত্রিক হয়েছে; দ্বিতীয়ত, অসম্পাদিত লেখা, গুজব বা মতামত প্রকাশের ফলে সমাজের স্থিতিশীলতা কখনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু আন্দোলন, সংগ্রামের বাস্তব প্রয়োগ ও তার ফলাফল পর্যালোচনা করলে তা দেখা যায়।

ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেলেও ব্যবহারে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের বিষয়ে কিন্তু সচেতনতার অভাব প্রকট। অনেকে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা না করেই ছবি বা বক্তব্য পোস্ট করেন। উদাহরণস্বরূপ, মেলবোর্ন থেকে এক বাংলাদেশি এক সাদা নারীর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করলেন। ঘোষণা দিলেন, তিনি বিয়ে করেছেন। অনেক ‘অভিনন্দন’ ও ‘লাইক’ জুটল। পরে একই ব্যক্তি লিখলেন, আসলে ওই নারীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়নি। তারা শুধু পর্ার্টিতে গিয়েছিলেন। মানুষ বিভিন্নরকম প্রতীকের সাহায্যে অর্থ প্রদান করে। এক একটি ছবি বা স্ট্যাটাস এক একটি প্রতীক, যার বিভিন্ন রকম অর্থ হতে পারে। শ্বেতাঙ্গ নারীর সঙ্গে ছবি পোস্ট করে একজন হয়তো প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারে একজনের সঙ্গীভাগ্যে অথবা এটি হতে পারে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সেটি হচ্ছে, ফেসবুক ব্যবহারকারী পাঠকের দিকটি বিবেচনায় না রাখা। মনে হচ্ছে, একটি পোস্ট যার জন্য, সে কতটুকু গ্রহণ বা বর্জন করবে। কী প্রভাব ফেলবে তার মনে, কিইবা তার প্রাসঙ্গিতা? এসব বিবেচনায় না এনে অনেক সময় অনেকে পোস্ট করেন। যেমন কেউ পরিবারের সদস্যদের কিছু ছবি পোস্ট করলেন, অথচ প্রাইভেসি সেটিং না থাকাতে বন্ধু, অবন্ধু সবাই সেগুলো দেখতে পায়। অনেক সময় পোস্টের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কে কত বড়, কার কত ভালোবাসা আছে, তা প্রমাণে জাহির করা। যেমন অনেক পদের খাবার উপভোগ না করে সেগুলোর ছবি আপলোড করা। এতে ছবিগুলো যে দেখল তার কী লাভ হলো? খাবার দেখে জিহ্বায় পানি এলেও তা সে খেতে পারল না। সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্গম জায়গায় পড়ে গিয়ে মৃত্যুর খবরও এখন জানা যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, সেলফি তোলার উদ্দেশ্য কিন্তু ফেসবুকে বা অনুরূপ সাইটে প্রকাশ করা।

কখনও কখনও ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিপাকে পড়ে থাকেন। মানুষ তাদেরকেই পছন্দ করে, যারা তাদেরকে পছন্দ করে অর্থাৎ সমমনা, সমান রুচির মানুষদের। আবার অনেকে চড়া তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দেন। অনেকে না বুঝে ‘লাইক’ দেন। ‘লাইক’ কেনাবেচারও খবর পাওয়া যায়। কেউ প্রত্যাশিত সংখ্যক ‘লাইক’ না পেয়ে নিরাশ হন বা পোস্ট সরিয়ে ফেলেন। ফেসবুকের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে।

ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে গবেষণাও শুরু হয়ে গেছে। কানাডার গুয়েল্প বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ফেসবুকের মাধ্যমে ঈর্ষা ছড়ানো হয়। কেননা মানুষ সাধারণত জীবনে ঘটে যাওয়া অধিকতর সুখকর ঘটনাবলিই তুলে ধরে। ফেসবুকে গেলে কখনও কখনও মনে হবে, আসলেই ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।’ অন্যের সাফল্যের খবর দেখে মনে হতে পারে, হায়! আমার জীবন ব্যর্থ। অন্যের বেড়াতে যাওয়ার ছবি দেখে মনে হতে পারে, সব মজা অন্যেরা করে নিচ্ছে। এত সব দেখে বিষাদ ও বিষণ্ণতার জন্ম হতে পারে। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, ফেসবুক ব্যবহার নারীর মধ্যে নিজ শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টির জন্ম দেয়। কেননা নারীরা নিজেদের শরীরের ব্যাপারে বেশি সচেতন হয়ে থাকেন এবং সম্ভবত অন্যের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। কিছু কিছু মনোবিজ্ঞানী অবশ্য দাবি করছেন, ফেসবুক ব্যবহার একটি সুখকর অভিজ্ঞতাও বটে।

যাপিতজীবনে চলার পথ মসৃণ নয়। সেখানে সুখবোধ, দুঃখবোধ আছে, থাকবে। জীবনের অনেক দুঃখানুভূতি, অনেক না পাওয়া, অনেক অপ্রাপ্তি ফেসবুকের পাতায় পাতায় ভেসে ওঠে না। অন্যভাবে বলা যায়, ফেসবুকের পাতায় যে জীবনকে দেখি, আদতে জীবন তার চেয়ে অনেক জটিলতর। সমাজবিজ্ঞানী গফম্যান বলেন, দৈনন্দিন জীবনে মানুষ সাধারণত তার ভালো রুচিবোধকে বেশি প্রকাশ করে থাকে। মানুষের আচরণ সমাজে অন্য মানুষের প্রত্যাশা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। মানুষের এই প্রয়াসকে সমাজবিজ্ঞানী গফম্যান ‘ব্যক্তিত্বের ব্যবস্থাপনা’ বলেছেন। শেক্সপিয়রও বলেছেন একই কথা। নর-নারী জগতে অভিনয় করে। ভালো থাকার অভিনয়, ভালো রুচিবোধ থাকার অভিনয় ইত্যাদি। অভিনয় না করে কীভাবে ভালো থাকা যায় এই নেটওয়ার্ক সমাজে? কীভাবে কাটানো যাবে ফেসবুক বিষণ্ণতা? যাপিতজীবন ও উপস্থাপিত জীবনের পার্থক্য বোঝা। সেই সঙ্গে সবার ফেসবুক ব্যবহারে আরও দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল আচরণের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। সত্যিকার অর্থে, ফেসবুকের সুপ্রভাব বা কুপ্রভাব সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করে এর সংবেদনশীল ও সচেতন ব্যবহারের ওপর। তাই ফেসবুক ব্যবহারে অনেক বেশি সচেতন ও কৌশলী হতে হবে।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী শিক্ষক; গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments

ড. কামরুল হাসান ও ড. তুহিন রায়::ফেসবুক হলো নিজের ব্যক্তিত্ব ও ভাবমূর্তি অন্যের সামনে তুলে ধরার অবারিত খোলা মাঠ। এটি নিয়ন্ত্রণের ভার অনেকাংশে আমাদের ওপর। অবাধ তথ্যপ্রবাহের ওই যুগে আবেগ-অনুভূতি, চিন্তা-ভাবনা, তথ্য প্রকাশের অন্যতম সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক। বর্তমান সময়ে ফেসবুক দৈনন্দিন জীবনের একটি অংশ হয়ে গেছে। কাউকে চেনা বা জানা এবং তার সঙ্গে বন্ধুত্ব এককথা না হলেও ফেসবুকের কল্যাণে তারা বন্ধু হয়ে গেছেন। সে জন্য ‘প্রকৃত বন্ধু’ ও ‘ফেসবুক বন্ধু’র মধ্যে তফাত বোঝানোর জন্যও ‘ফেসবুক বন্ধু’ কথাটি ব্যবহার করা হয়। তবে সবাই কমবেশি কিছুক্ষণ পরপর ফেসবুক বন্ধুর সঙ্গে একটু ঘুরে আসার প্রয়োজনবোধ করেন। কখনও চাপ অনুভব করেন। কারও কাছে এটি একরকম খণ্ডকালীন চাকরির মতো। সচেতনভাবে, দায়িত্বশীলতার সঙ্গে ব্যবহার না করলে ফেসবুক হয়ে উঠতে পারে অসুখী হওয়ার মুখ্য কারণ। বিশেষ করে, শিক্ষিত জনগোষ্ঠী কোনোভাবেই ফেসবুক ব্যবহারের ক্ষেত্রে তাদের দায়িত্বশীল আচরণকে এড়িয়ে যেতে পারেন না।

‘যারা হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল’, তাদের জন্য ফেসবুক এনে দিয়েছে অবারিত সুযোগ। সাইবার বিপ্লবের ফলে মানুষ সহজে তার মতামত, চিন্তা-ভাবনা প্রকাশ করতে পারছে। অনেকেই মনে করেন, আমরা এখন তথ্যযুগে প্রবেশ করেছি। তথ্যের অবাধ প্রবাহের এই যুগে অনলাইনে যে সমাজ গড়ে উঠেছে, সমাজবিজ্ঞানী ম্যানুয়েল ক্যাস্টেল তার নাম দিয়েছেন ‘নেটওয়ার্ক সমাজ’। এই নেটওয়ার্ক সমাজের কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা নেই। সে যাই হোক, সাইবার স্পেসে এখন সমাজ, রাজনীতি, ধর্মবিষয়ক মতাদর্শ প্রচার করা খুবই সহজ হয়ে গেছে। এর ফলে মূলত দুটি পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। প্রথমত, মতামত প্রকাশের ক্ষেত্রটি কিছুটা গণতান্ত্রিক হয়েছে; দ্বিতীয়ত, অসম্পাদিত লেখা, গুজব বা মতামত প্রকাশের ফলে সমাজের স্থিতিশীলতা কখনও হুমকির মুখে পড়তে পারে। সম্প্রতি ঘটে যাওয়া কিছু আন্দোলন, সংগ্রামের বাস্তব প্রয়োগ ও তার ফলাফল পর্যালোচনা করলে তা দেখা যায়।

ফেসবুক ব্যবহারকারীর সংখ্যা জ্যামিতিক হারে বৃদ্ধি পেলেও ব্যবহারে ব্যক্তিত্ব প্রকাশের বিষয়ে কিন্তু সচেতনতার অভাব প্রকট। অনেকে যথেষ্ট চিন্তা-ভাবনা না করেই ছবি বা বক্তব্য পোস্ট করেন। উদাহরণস্বরূপ, মেলবোর্ন থেকে এক বাংলাদেশি এক সাদা নারীর সঙ্গে একটি ছবি পোস্ট করলেন। ঘোষণা দিলেন, তিনি বিয়ে করেছেন। অনেক ‘অভিনন্দন’ ও ‘লাইক’ জুটল। পরে একই ব্যক্তি লিখলেন, আসলে ওই নারীর সঙ্গে তার বিয়ে হয়নি। তারা শুধু পর্ার্টিতে গিয়েছিলেন। মানুষ বিভিন্নরকম প্রতীকের সাহায্যে অর্থ প্রদান করে। এক একটি ছবি বা স্ট্যাটাস এক একটি প্রতীক, যার বিভিন্ন রকম অর্থ হতে পারে। শ্বেতাঙ্গ নারীর সঙ্গে ছবি পোস্ট করে একজন হয়তো প্রমাণ করার চেষ্টা করতে পারে একজনের সঙ্গীভাগ্যে অথবা এটি হতে পারে মনোযোগ আকর্ষণের চেষ্টা।

আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। সেটি হচ্ছে, ফেসবুক ব্যবহারকারী পাঠকের দিকটি বিবেচনায় না রাখা। মনে হচ্ছে, একটি পোস্ট যার জন্য, সে কতটুকু গ্রহণ বা বর্জন করবে। কী প্রভাব ফেলবে তার মনে, কিইবা তার প্রাসঙ্গিতা? এসব বিবেচনায় না এনে অনেক সময় অনেকে পোস্ট করেন। যেমন কেউ পরিবারের সদস্যদের কিছু ছবি পোস্ট করলেন, অথচ প্রাইভেসি সেটিং না থাকাতে বন্ধু, অবন্ধু সবাই সেগুলো দেখতে পায়। অনেক সময় পোস্টের উদ্দেশ্য হচ্ছে, কে কত বড়, কার কত ভালোবাসা আছে, তা প্রমাণে জাহির করা। যেমন অনেক পদের খাবার উপভোগ না করে সেগুলোর ছবি আপলোড করা। এতে ছবিগুলো যে দেখল তার কী লাভ হলো? খাবার দেখে জিহ্বায় পানি এলেও তা সে খেতে পারল না। সেলফি তুলতে গিয়ে দুর্গম জায়গায় পড়ে গিয়ে মৃত্যুর খবরও এখন জানা যাচ্ছে। বলা বাহুল্য, সেলফি তোলার উদ্দেশ্য কিন্তু ফেসবুকে বা অনুরূপ সাইটে প্রকাশ করা।

কখনও কখনও ফেসবুক ব্যবহারকারীরা বিপাকে পড়ে থাকেন। মানুষ তাদেরকেই পছন্দ করে, যারা তাদেরকে পছন্দ করে অর্থাৎ সমমনা, সমান রুচির মানুষদের। আবার অনেকে চড়া তির্যক মন্তব্য ছুড়ে দেন। অনেকে না বুঝে ‘লাইক’ দেন। ‘লাইক’ কেনাবেচারও খবর পাওয়া যায়। কেউ প্রত্যাশিত সংখ্যক ‘লাইক’ না পেয়ে নিরাশ হন বা পোস্ট সরিয়ে ফেলেন। ফেসবুকের মাধ্যমে প্রেমের ফাঁদে ফেলে ধর্ষণের ঘটনাও ঘটছে।

ইতিমধ্যে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম নিয়ে গবেষণাও শুরু হয়ে গেছে। কানাডার গুয়েল্প বিশ্ববিদ্যালয় থেকে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, ফেসবুকের মাধ্যমে ঈর্ষা ছড়ানো হয়। কেননা মানুষ সাধারণত জীবনে ঘটে যাওয়া অধিকতর সুখকর ঘটনাবলিই তুলে ধরে। ফেসবুকে গেলে কখনও কখনও মনে হবে, আসলেই ‘আনন্দধারা বহিছে ভুবনে।’ অন্যের সাফল্যের খবর দেখে মনে হতে পারে, হায়! আমার জীবন ব্যর্থ। অন্যের বেড়াতে যাওয়ার ছবি দেখে মনে হতে পারে, সব মজা অন্যেরা করে নিচ্ছে। এত সব দেখে বিষাদ ও বিষণ্ণতার জন্ম হতে পারে। সম্প্রতি নিউজিল্যান্ডের অকল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এক গবেষণায় দেখা যায়, ফেসবুক ব্যবহার নারীর মধ্যে নিজ শরীর নিয়ে অসন্তুষ্টির জন্ম দেয়। কেননা নারীরা নিজেদের শরীরের ব্যাপারে বেশি সচেতন হয়ে থাকেন এবং সম্ভবত অন্যের সঙ্গে তুলনা করে থাকেন। কিছু কিছু মনোবিজ্ঞানী অবশ্য দাবি করছেন, ফেসবুক ব্যবহার একটি সুখকর অভিজ্ঞতাও বটে।

যাপিতজীবনে চলার পথ মসৃণ নয়। সেখানে সুখবোধ, দুঃখবোধ আছে, থাকবে। জীবনের অনেক দুঃখানুভূতি, অনেক না পাওয়া, অনেক অপ্রাপ্তি ফেসবুকের পাতায় পাতায় ভেসে ওঠে না। অন্যভাবে বলা যায়, ফেসবুকের পাতায় যে জীবনকে দেখি, আদতে জীবন তার চেয়ে অনেক জটিলতর। সমাজবিজ্ঞানী গফম্যান বলেন, দৈনন্দিন জীবনে মানুষ সাধারণত তার ভালো রুচিবোধকে বেশি প্রকাশ করে থাকে। মানুষের আচরণ সমাজে অন্য মানুষের প্রত্যাশা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে থাকে। মানুষের এই প্রয়াসকে সমাজবিজ্ঞানী গফম্যান ‘ব্যক্তিত্বের ব্যবস্থাপনা’ বলেছেন। শেক্সপিয়রও বলেছেন একই কথা। নর-নারী জগতে অভিনয় করে। ভালো থাকার অভিনয়, ভালো রুচিবোধ থাকার অভিনয় ইত্যাদি। অভিনয় না করে কীভাবে ভালো থাকা যায় এই নেটওয়ার্ক সমাজে? কীভাবে কাটানো যাবে ফেসবুক বিষণ্ণতা? যাপিতজীবন ও উপস্থাপিত জীবনের পার্থক্য বোঝা। সেই সঙ্গে সবার ফেসবুক ব্যবহারে আরও দায়িত্বশীল ও সংবেদনশীল আচরণের অভ্যাস গড়ে তোলা উচিত। সত্যিকার অর্থে, ফেসবুকের সুপ্রভাব বা কুপ্রভাব সম্পূর্ণভাবেই নির্ভর করে এর সংবেদনশীল ও সচেতন ব্যবহারের ওপর। তাই ফেসবুক ব্যবহারে অনেক বেশি সচেতন ও কৌশলী হতে হবে।

লেখকদ্বয় যথাক্রমে অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী শিক্ষক; গবেষক ও সহযোগী অধ্যাপক, সমাজবিজ্ঞান ডিসিপ্লিন

খুলনা বিশ্ববিদ্যালয়

Facebook Comments

এ জাতীয় আরো খবর