আজঃ ১১ই আশ্বিন ১৪২৫ - ২৬শে সেপ্টেম্বর ২০১৮ - বিকাল ৩:৪৪

রাত জাগা সিলেট নগরী!

Published: জুন ২৯, ২০১৬ - ১১:৫৩ অপরাহ্ণ

sylpro24

sylpro24

ডেস্ক:পবিত্র রমজান মাসে যাঁরা সিলেটে আসেননি, তাঁরা এ দৃশ্য কল্পনাও করতে পারবেন না। এ সময় এই নগরের মানুষের জীবনযাত্রা অন্য সময়ের তুলনায় একেবারে বদলে যায়। সিলেট হয়ে ওঠে রাতজাগা এক নগর। রমজান মাসের চাঁদ ওঠার রাত থেকেই সিলেট নগরবাসীর দৈনন্দিন রুটিনটা আগের মতো থাকে না। তারাবি নামাজের পর এখানকার প্রায় সবাই জেগে থাকেন। কেউ ইবাদত- বন্দেগিতে সময় কাটান। কেউবা গল্পগুজব করেন। কেউ যান ঈদের জন্য নতুন পোশাক- গয়না কিনতে। যাঁরা কেনাকাটা করেন না, তাঁরা রাতের সিলেটের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কোথায়? বিখ্যাত কিন ব্রিজ বা নান্দনিক স্থাপত্যের প্রতীক কাজিরবাজার ব্রিজে। কাজিরবাজার ব্রিজের ওপরই দেখলাম রাতে শত শত মানুষ ভিড় জমিয়েছেন। আর দিনের বেলায় সিলেট নগরের ব্যস্ততম জিন্দাবাজার এলাকায় দেখেছি, কী সুনশান! সকালে রাস্তা একেবারে ফাঁকা। যাকে বলে কাকপক্ষীটিও ওড়ে না। এমনকি সকালে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও দেখা যায় না। রাজধানী ঢাকায় সকালে বের হলে দেখা যায়, কোথাও ময়লার স্তূপ, কোথাও ময়লাবাহী গাড়ি চলাচলের নামে মানুষের অহেতুক দুর্ভোগ। কোথাও বা রাস্তা পরিষ্কার করার নামে বাতাসে আবর্জনা ও দূষণ ছড়ানো হয়। অনেক সময় নাকে রুমাল চেপেও রেহাই পাওয়া যায় না। অথচ সিলেট সিটি করপোরেশনে এখন মেয়র নেই, তারপরও কর্তৃপক্ষ ময়লা নেওয়ার কাজটি রাতেই শেষ করছে। ঢাকায় দুজন ‘তরুণ ও উদ্যমী’ মেয়র আছেন। উত্তরে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন। তাঁরা ‘গ্রিন ঢাকা’, ‘ক্লিন ঢাকা’ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। অনেক অঙ্গীকার করছেন। কিন্তু সিলেটের মতো ময়লা নেওয়ার ছোট্ট কাজটি কি রাতেই তাঁরা শেষ করতে পারেন না? তা করলে দিনের বেলায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ এ কারণে হওয়া দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পান। অনেকের ধারণা, সিলেটের সমাজ খুব রক্ষণশীল। কিন্তু গত কয়েক দিন শহরে ঘুরে সেটি মনে হলো না। বারুতখানা মনির ম্যানশনের তিনতলায় প্রথম আলোর সিলেট অফিস। দোতলায় ‘গার্লস’ নামের একটি বিউটি পারলার ও নিচতলায় ‘নাইওরি’ নামের আরেকটি দোকান আছে। দুই সহকর্মীসহ আমরা যখন সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছিলাম, তখন ফুটপাতে দাঁড়ানো এক তরুণী বললেন, ‘আপনারা ওপরে যাচ্ছেন কেন? ওটা তো মেয়েদের পারলার।’ তাঁকে বললাম, মেয়েদের পারলারের ওপরে প্রথম আলো নামের একটি মনের পারলার আছে। সেখানে ছেলেমেয়ে কারও যেতে বাধা নেই। সিলেটে দেখেছি, মেয়েরা মোটরবাইক চালাচ্ছেন, পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই একাকী মার্কেটে কেনাকাটা করছেন। মেয়েরা দোকান চালাচ্ছেন। ‘বইপত্র’ নামে সিলেটের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকানটিও চালাচ্ছেন সেলিমা সুলতানা নামের এক নারী। রমজান মাসে বেলা ১১টার আগে কোনো দোকান খোলে না। খুললেও ক্রেতা পাওয়া যায় না। দুপুরের পর দোকানগুলো সরগরম হতে থাকে। বেলা যতটা পড়তির দিকে, ততই ভিড় বাড়তে থাকে। ইফতারের পর দোকানগুলো আলো-ঝলমলে হয়ে ওঠে। ঢাকায় ফুটপাত ও বিপণিবিতানের ক্রেতা প্রায় সমান সমান। কিন্তু সিলেটে ফুটপাতের দোকান কম, আলো-ঝলমলে বাহারি বিপণিবিতানের সংখ্যাই বেশি। প্রায় প্রতিটি বিপণিবিতান আলোকসজ্জিত। অনেক বিপণিবিতানের সামনে বিয়েবাড়ির মতো বর্ণিল তোরণ বসানো হয়েছে। নগরের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা, নয়াসড়ক, কুমারপাড়া, বারুতখানা, জেলরোড, আম্বরখানা এলাকার বিপণিবিতানগুলোতে রাতে মনে হয় উৎসব লেগেছে। আসলে গোটা সিলেটজুড়েই রাতে এই দৃশ্য। কেনাকাটা শেষ করে অনেকে সাহরির আগে আগে বাসায় ফেরেন। কেউ বা সাহরিও রেস্তোরাঁয় সারেন। জল্লারপাড় এলাকার পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট, জিন্দাবাজারের পানসী, ভোজনবাড়ি, পালকিসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বিরাট বিরাট সাহরির আয়োজন। গত রোববার আমরা একটি হোটেলে দুজন গিয়েছিলাম ইফতার করতে। বললেন, চারজন একত্রে আসতে হবে। একজন-দুজনের জন্য আলাদা আয়োজন নেই। জিন্দাবাজারের সিটি শপিং সেন্টার, আল-হামরা শপিং সিটি, মিলেনিয়াম, ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড, ব্লু-ওয়াটার, কানিজ প্লাজা, শুকরিয়া, সিলেট প্লাজা; বন্দরবাজারের মধুবন সুপার মার্কেট, হাসান মার্কেট; নয়াসড়কের আড়ং, মাহা, শী, মনোরম, মাম্মী; কুমারপাড়ার বীরবিক্রম ইয়ামিন কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেল, মধ্যরাতেও ক্রেতাদের ভিড়। তবে সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলেই রাতের সিলেট জেগে থাকতে পারছে। দুই-একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া গত এক মাসে শহরে ছিনতাই- চুরির ঘটনা ঘটেনি। মানুষ ঘরে-বাইরে নিজেকে নিরাপদ ভাবছে। পুরো বাংলাদেশটা যদি সিলেট হতো।

Facebook Comments
sylpro24

sylpro24

ডেস্ক:পবিত্র রমজান মাসে যাঁরা সিলেটে আসেননি, তাঁরা এ দৃশ্য কল্পনাও করতে পারবেন না। এ সময় এই নগরের মানুষের জীবনযাত্রা অন্য সময়ের তুলনায় একেবারে বদলে যায়। সিলেট হয়ে ওঠে রাতজাগা এক নগর। রমজান মাসের চাঁদ ওঠার রাত থেকেই সিলেট নগরবাসীর দৈনন্দিন রুটিনটা আগের মতো থাকে না। তারাবি নামাজের পর এখানকার প্রায় সবাই জেগে থাকেন। কেউ ইবাদত- বন্দেগিতে সময় কাটান। কেউবা গল্পগুজব করেন। কেউ যান ঈদের জন্য নতুন পোশাক- গয়না কিনতে। যাঁরা কেনাকাটা করেন না, তাঁরা রাতের সিলেটের সৌন্দর্য উপভোগ করেন। কোথায়? বিখ্যাত কিন ব্রিজ বা নান্দনিক স্থাপত্যের প্রতীক কাজিরবাজার ব্রিজে। কাজিরবাজার ব্রিজের ওপরই দেখলাম রাতে শত শত মানুষ ভিড় জমিয়েছেন। আর দিনের বেলায় সিলেট নগরের ব্যস্ততম জিন্দাবাজার এলাকায় দেখেছি, কী সুনশান! সকালে রাস্তা একেবারে ফাঁকা। যাকে বলে কাকপক্ষীটিও ওড়ে না। এমনকি সকালে সিটি করপোরেশনের পরিচ্ছন্নতাকর্মীদেরও দেখা যায় না। রাজধানী ঢাকায় সকালে বের হলে দেখা যায়, কোথাও ময়লার স্তূপ, কোথাও ময়লাবাহী গাড়ি চলাচলের নামে মানুষের অহেতুক দুর্ভোগ। কোথাও বা রাস্তা পরিষ্কার করার নামে বাতাসে আবর্জনা ও দূষণ ছড়ানো হয়। অনেক সময় নাকে রুমাল চেপেও রেহাই পাওয়া যায় না। অথচ সিলেট সিটি করপোরেশনে এখন মেয়র নেই, তারপরও কর্তৃপক্ষ ময়লা নেওয়ার কাজটি রাতেই শেষ করছে। ঢাকায় দুজন ‘তরুণ ও উদ্যমী’ মেয়র আছেন। উত্তরে আনিসুল হক, দক্ষিণে সাঈদ খোকন। তাঁরা ‘গ্রিন ঢাকা’, ‘ক্লিন ঢাকা’ গড়ার স্বপ্ন দেখাচ্ছেন। অনেক অঙ্গীকার করছেন। কিন্তু সিলেটের মতো ময়লা নেওয়ার ছোট্ট কাজটি কি রাতেই তাঁরা শেষ করতে পারেন না? তা করলে দিনের বেলায় প্রায় দেড় কোটি মানুষ এ কারণে হওয়া দুর্ভোগ থেকে রক্ষা পান। অনেকের ধারণা, সিলেটের সমাজ খুব রক্ষণশীল। কিন্তু গত কয়েক দিন শহরে ঘুরে সেটি মনে হলো না। বারুতখানা মনির ম্যানশনের তিনতলায় প্রথম আলোর সিলেট অফিস। দোতলায় ‘গার্লস’ নামের একটি বিউটি পারলার ও নিচতলায় ‘নাইওরি’ নামের আরেকটি দোকান আছে। দুই সহকর্মীসহ আমরা যখন সিঁড়ি ভেঙে ওপরে উঠছিলাম, তখন ফুটপাতে দাঁড়ানো এক তরুণী বললেন, ‘আপনারা ওপরে যাচ্ছেন কেন? ওটা তো মেয়েদের পারলার।’ তাঁকে বললাম, মেয়েদের পারলারের ওপরে প্রথম আলো নামের একটি মনের পারলার আছে। সেখানে ছেলেমেয়ে কারও যেতে বাধা নেই। সিলেটে দেখেছি, মেয়েরা মোটরবাইক চালাচ্ছেন, পুরুষ সঙ্গী ছাড়াই একাকী মার্কেটে কেনাকাটা করছেন। মেয়েরা দোকান চালাচ্ছেন। ‘বইপত্র’ নামে সিলেটের সবচেয়ে বড় বইয়ের দোকানটিও চালাচ্ছেন সেলিমা সুলতানা নামের এক নারী। রমজান মাসে বেলা ১১টার আগে কোনো দোকান খোলে না। খুললেও ক্রেতা পাওয়া যায় না। দুপুরের পর দোকানগুলো সরগরম হতে থাকে। বেলা যতটা পড়তির দিকে, ততই ভিড় বাড়তে থাকে। ইফতারের পর দোকানগুলো আলো-ঝলমলে হয়ে ওঠে। ঢাকায় ফুটপাত ও বিপণিবিতানের ক্রেতা প্রায় সমান সমান। কিন্তু সিলেটে ফুটপাতের দোকান কম, আলো-ঝলমলে বাহারি বিপণিবিতানের সংখ্যাই বেশি। প্রায় প্রতিটি বিপণিবিতান আলোকসজ্জিত। অনেক বিপণিবিতানের সামনে বিয়েবাড়ির মতো বর্ণিল তোরণ বসানো হয়েছে। নগরের জিন্দাবাজার, বন্দরবাজার, চৌহাট্টা, নয়াসড়ক, কুমারপাড়া, বারুতখানা, জেলরোড, আম্বরখানা এলাকার বিপণিবিতানগুলোতে রাতে মনে হয় উৎসব লেগেছে। আসলে গোটা সিলেটজুড়েই রাতে এই দৃশ্য। কেনাকাটা শেষ করে অনেকে সাহরির আগে আগে বাসায় ফেরেন। কেউ বা সাহরিও রেস্তোরাঁয় সারেন। জল্লারপাড় এলাকার পাঁচ ভাই রেস্টুরেন্ট, জিন্দাবাজারের পানসী, ভোজনবাড়ি, পালকিসহ বিভিন্ন রেস্তোরাঁয় বিরাট বিরাট সাহরির আয়োজন। গত রোববার আমরা একটি হোটেলে দুজন গিয়েছিলাম ইফতার করতে। বললেন, চারজন একত্রে আসতে হবে। একজন-দুজনের জন্য আলাদা আয়োজন নেই। জিন্দাবাজারের সিটি শপিং সেন্টার, আল-হামরা শপিং সিটি, মিলেনিয়াম, ওয়েস্ট ওয়ার্ল্ড, ব্লু-ওয়াটার, কানিজ প্লাজা, শুকরিয়া, সিলেট প্লাজা; বন্দরবাজারের মধুবন সুপার মার্কেট, হাসান মার্কেট; নয়াসড়কের আড়ং, মাহা, শী, মনোরম, মাম্মী; কুমারপাড়ার বীরবিক্রম ইয়ামিন কমপ্লেক্স ঘুরে দেখা গেল, মধ্যরাতেও ক্রেতাদের ভিড়। তবে সিলেটে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো বলেই রাতের সিলেট জেগে থাকতে পারছে। দুই-একটি বিক্ষিপ্ত ঘটনা ছাড়া গত এক মাসে শহরে ছিনতাই- চুরির ঘটনা ঘটেনি। মানুষ ঘরে-বাইরে নিজেকে নিরাপদ ভাবছে। পুরো বাংলাদেশটা যদি সিলেট হতো।

Facebook Comments

এ জাতীয় আরো খবর