ভ্রমণ কাহিনীঃপাহাড় আর নীল জলের সাথে মিতালি….

ছোটবেলা থেকে আমার ঘুরাঘুরির খুব ইচ্ছা। যখনই কোথাও ঘুরতে যাবার সুযোগ পাই মিস করতে চাই না। ফলে এবারও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লাম প্রকৃতির রূপ-বৈচিত্র আস্বাদনে। কয়েকদিন ধরে বেশ শীত পড়েছে, শীতের ভ্রমণে অদ্ভুত ধরনের আনন্দ কাজ করে,যা অন্যকোনো ঋতুতে পাওয়া যায় না। দিনক্ষণ আগে থেকেই জানা ছিলো। ১০ জানুয়ারি রাত ৮টায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে সবাই এসে উপস্থিত হলাম। আমাদের ব্যাচের ১৯জন ছাত্র-ছাত্রী। আমাদের সাথে ছিলেন ডিপার্টমেন্ট এর প্রিয়মুখ প্রফেসর দিলারা রহমান ম্যাম। রাত সাড়ে দশটায় পাহাড়িকা ট্রেনে চড়ে যাত্রা শুরু করলাম, উদ্দেশ্য চট্টগ্রাম। ট্রেনে উঠে সবাই একসাথে গান ধরলাম “চলোনা ঘুরে আসি অজানাতে, আলো আলো.. বসনন্ত বাতাসে সইগো। ম্যামও আমাদের সাথে সুর মিলালেন । গান, কবিতা আড্ডা আর হৈ-হুল্লোরে কিভাবে কিভাবে যেনো ১১ঘন্টার দীর্ঘ ট্রেন যাত্রা শেষ হলো। পরদিন সকাল বেলা চট্টগ্রাম পৌছাই,সেখানে আমাদের রিসিভ করেন ট্যুরিস্ট গাইড আকিল। বলে রাখা ভালো তিনি ঢাবিতে পড়াশোনা করেন। দেখতে শুনতে স্মার্ট। মনে হচ্ছে ভালোই গাইড দিবেন। যাই হোক হালকা নাস্তা সেরে সবাই বান্দরবান এর গাড়িতে চড়ে বসি। আকাবাকা পথ আর দু’দিকে সারি সারি বটবৃক্ষ যেনো তার সবটুকু দিয়ে আমাদের নিমন্ত্রণ করছে তার রূপ গাহনে! দুপুরের দিকে বান্দরবান পৌছে লাঞ্চ করে বেরিয়ে পড়ি নীলাচল দর্শনে। নীলাচলকে বলা হয় বাংলাদেশের দার্জিলিং। এখান থেকে সমগ্র বান্দরবান শহর একনজরে দেখা যায়। সবচেয়ে মজা যে জিনিসটা লেগেছে সেটা হলো ‘চান্দের পাহাড় ‘ গাড়ি। আমাদের সিলেটে যে লেগুনা দেখি তার মতোই এই গাড়িগুলো। উপর খোলা, যাত্রীরা যাতে দাঁড়িয়ে প্রাকৃতিক পরিবেশ দেখতে পারে তার জন্য এই ব্যবস্থা। নীলাচল ঘন্টা দেড়েকের মতো ছিলাম। উঁচু টিলা থেকে নীচে পাহাড়ের গায়ে জমে থাকা মেঘমালা, উপরে নীল আকাশ তার সব সৌন্দর্য্য দিয়ে ঘিরে রেখেছে নীলাচলকে। আমরা নিজেদের ক্যামেরার ফ্রেমে আবদ্ধ করলাম। সন্ধ্যা হয়ে গেছে ফিরতে হবে। আমরা আবার চান্দের গাড়িতে উঠে পড়ি, আকাশে রূপালি চাঁদ মায়া ঢেলে দিচ্ছে আর গাড়ি ছুটে চলছে হোটেলের দিকে। আমি গান ধরলাম, “চাদের হাসি বাধ ভেঙেছে উছলে পড়ে আলো/ও রজনী গন্ধ্যা তোমার গন্ধশুধা ঢালো/ চাঁদ কেনো আসেনা আমার ঘরে। পরদিন ভোরে বান্দরবানের বিভিন্ন স্পট ঘুরে দেখি তার মধ্যে নীলগিরি ছিলো অন্যতম। নীলগিরি যেতে ঘন্টা দুয়েক সময় লাগে। চান্দের গাড়িতে চড়ে আমরা এগিয়ে যেতে লাগলাম নীলগিরির দিকে ;মনে পড়লো দিজেন্দ্রলাল রায়ের সেই বিখ্যাত গান “এমনটি দেশটি কোথাও খুজে পাবে নাকো তুমি” আসলেই তো এত্ত সুন্দর। না দেখলে কীযে মিস হতো। নীলগিরিতে গিয়ে অনেকক্ষণ ঘুরলাম। ট্যুরিস্টদের সুবিধার্থে এখানে ছোট ছোট দোকান গড়ে উঠেছে। আমরা সেই দোকান থেকে চা/কফি পান করে দৌড়ে টিলার উপর উঠে যে যার মতো ঘুরলাম। ফিরতি পথে শৈলকুপা নামি,এটি ঠান্ডা পানির ঝর্ণা। এখানে অল্পক্ষণ ছিলাম। স্থানীয় নৃতাত্ত্বিক জনগোষ্ঠী হস্তশিপ্লের বাহার নিয়ে বসছেন, এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য ছিল নকশী কাথা,গামছা, বিছানার চাদর ইত্যাদি বান্দরবান দুদিন ছিলাম। ভীষণ ভালো লেগেছিল। খুব শান্তশিষ্ট শহর, ধূলাবালি মুক্ত আর মানুষগুলো খুব মিশুক কিন্ত, এখানে পড়ে থাকলেতো হবে না। পরের দিন কক্সবাজারের উদ্দেশ্যে বের হই। গন্তব্য বাংলাদেশের একমাত্র প্রবাল দ্বীপ সেন্ট মার্টিন দেখা। সেন্ট মার্টিন দ্বীপকে নারিকেল জিঞ্জিরাও বলা হয়। কক্সবাজার একদিন থেকে ১৪জানুয়ারি সেন্টমার্টিন যাই। যাবার পথে উত্তাল ঢেউ আর গাঙচিলের উড়ে বেড়ানো খুব উপভোগ্য ছিলো। ক্লান্ত দেহে হোটেল রুমে গিয়ে রেস্ট নিই। আমরা যে হোটেলে উঠি সেখান থেকে সাগর খুবই নিকটে উত্তাল সাগরের গর্জন আমাদের কানে এসে বাজছিল। সন্ধ্যা পরে ম্যামের সাথে সাগরতীরে ঘুরে বেড়িয়েছি, কেমন একটা স্নিগ্ধতা চারিদিকে! আকাশে চন্দ্রীমা ছিলো তাই সেন্ট মার্টিন ভ্রমণ খুবই আনন্দদায়ক ছিলো। জোসনার প্রেমে পড়ে গিয়েছিলাম! যার আলোতে পুরো দ্বীপকে চাদের পাহাড় লাগছিলো। ভরা চন্দ্রীমায় আমাদের বারবিকিউ পার্টি হয়। এই পার্টিতে আমরা অনেক মজা করি, অনেকের তলের বিড়াল (মনের কথা) বেড়িয়ে আসছিলো। যাই হোক, এবার ফিরার পালা। ১৬তারিখ সকালে সবাই শেষবারের মতো সাগরের নীল জলে লাফালাফি করি। মিজান,মনসুর আর আলি ফুটবল নিয়ে মেতে ছিলো ;অন্যদিকে ম্যাম চেয়ারে বসে নীলজল এর অপার সৌন্দর্য দেখছিলেন। সত্যি বলতে বাংলাদেশের এই জায়গাগুলো না ঘুরলে বুঝতামই না এই দেশটা কত সুন্দর।

লিখেছেনঃ

sylpro24
sylpro24

শায়খুল ইসলাম

পিএসএস -৭ম ব্যাচ,শাবিপ্রবি,সিলেট।

Facebook Comments

Leave a Reply