আজঃ ১লা অগ্রহায়ণ ১৪২৫ - ১৫ই নভেম্বর ২০১৮ - রাত ১২:৪৩

১৫ আগস্টের হত্যাকাণ্ড রাতারাতি চেনা মানুষকে বদলে দিয়েছিলো : শেখ রেহানা

Published: আগ ১৫, ২০১৮ - ১০:১৫ অপরাহ্ণ

শেখ রেহানার সাক্ষাতকার নিচ্ছেন সত্যবাণীর সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশা

সিলেট প্রতিদিন :: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা ১৫ই আগষ্টের শোকাবহ ঘটনা নিয়ে সর্বপ্রথম নিজের কষ্ট ও অনুভূতি মিশ্রিত বিস্তারিত স্মৃতিচারণ করেছিলেন লন্ডন প্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক, লন্ডন থেকে প্রকাশিত সত্যবাণী পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশার সাথে ২০১৩ সালের অাগষ্টে জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে। শেখ রেহানার দীর্ঘ স্মৃতিচারণটি ঐবছর জাতীয় শোক দিবসের আগের দিনই প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে।

স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ড চেনা মানুষগুলোকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিলো। বিষ্ময় প্রকাশ করে তিনি ঐদিন বলেন, ‘মানুষ যে এত দ্রুত বদলাতে পারে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তা প্রথম বুঝতে পারলাম।’

তাঁর মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণে বেড়িয়ে আসে ১৫ই আগষ্ট পরবর্তী অকথিত অধ্যায়ের অনেক অজানা ঘটনা। দীর্ঘ স্মৃতিচারণে ১৫ই আগষ্ট পরবর্তী নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা যেমন তুলে ধরেন, তেমনি সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ঝানু রাজনীতিকের মত ফুটিয়ে তুলেন শেখ রেহানা।

এক্সক্লুসিভ স্মৃতিচারণে ফুটে উঠে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খোন্দকার মোশতাক আহমদের বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড: কামাল হোসেনের বিদেশে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের অনিহা প্রকাশের ঘটনাও অকটপ বর্ণণা দেন তিনি। কথায় কথায় পরিবার হারানো দুবোনকে নিরাপত্বা দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনিহা, ভারত থেকে লন্ডন যাওয়া, বঙ্গবন্ধুর খুনের ঘটনায় গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের আতুর ঘরেই মৃত্যু, এমন সব হৃদয়ছোঁয়া বিবরণই তুলে ধরেন তিনি। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জার্মানীতে সেসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীসহ আরও অনেকের প্রতি।

নিজের বিয়ে ও ব্যক্তি জীবন পর্বের অনেক না বলা কথাও এদিন নি:সংকোচে সত্যবাণী সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশাকে বলে দেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।

সৈয়দ আনাস পাশার সাথে শেখ রেহানার সেই হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতিচারণটি এবারের জাতীয় শোক দিবসে সিলেটপ্রতিদিনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

স্মৃতিচারণের ছবি তুলেছেন তৎকালীন সময়ের ১৩ বছরের কিশোর নাহিয়ান পাশা।

শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদ মিয়ার বিয়ের ছবি

দীর্ঘ স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা জানান, ১৫ই আগষ্ট কালোরাতের হত্যাকান্ডের সময় বোন শেখ হাসিনা পরিবারের সাথে তিনি ব্রাসেলসে অবস্থান করছিলেন। দুলাভাই ড: ওয়াজেদ মিয়া তখন জার্মানীর কার্লসওয়েতে বসবাস করতেন। স্বামীর সাথে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে বোন শেখ হাসিনা যখন জুলাই মাসের শেষের দিকে জার্মানীতে আসেন, তখন তাঁর সাথে বেড়াতে আসেন তিনি। ১৫ই আগষ্ট তাঁরা ব্রাসেলসে ছিলেন, এমনটি জানিয়ে রেহানা বলেন, দুলাভাইয়ের ছুটিতে আমরা বেড়াতে আসি ব্রাসেলসে। উঠি ব্রাসেলসে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়’।

*সারা জীবন কাঁদতে হতে পারে

এক্সক্লুসিভ স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা বলেন, ‘আমার বয়সী সানাউল হকের মেয়েদের সাথে ঐ রাতে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম আমি। আমাদের উচ্ছলতা ও হাসাহাসির তীব্র শব্দে দুলাভাই এক পর্যায়ে এসে ধমক দিলেন আমাকে। বললেন, এত হাসাহাসি ভালো নয়, এতে সারা জীবন কাঁদতে হতে পারে’।

শেখ রেহানা বলেন, ‘দুলাভাই যত বলেন, আমরা তত আরও বেশি হাসাহাসি করি’। তাঁর চোখ ছল ছল করা মন্তব্য, ‘মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই যে আমার এই হাসি চীরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, তা তখন কল্পনাই করতে পারিনি।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘১৫ই আগষ্ট ভোরে আপার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি ওঠো, ঢাকায় গোলমাল হয়েছে। গোলমাল, রাজনীতির কারণে আব্বার জেলে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো স্বাধীনতার আগে আমাদের জন্যে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা হলেও, এই গোলমাল যে সেই ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা নয়, তা বুঝতে অবশ্য আমাদের আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে’।

*আগের দিন খাতির, পরদিন বোঝা

বঙ্গবন্ধু তনয়া বলেন, আগের দিন রাষ্ট্রদূত সানাউল হক সাহেবের বাসায় এসে উঠেছি। আমরা প্রেসিডেন্টের মেয়ে, খাতির যত্নের কি বাহার। পরদিন পৃথিবীতে আমাদের কেউ নেই। নিস্ব অসহায় আমরা দুটো বোন তখন সানাউল হক সাহেবের কাছে বোঝা হিসেবে পরিণত হলাম। আমাদের সরিয়ে দিতে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন।’

রেহানা জানান, সানাউল হক নার্ভাস হয়ে তাদের সরিয়ে দিতে অস্থির হয়ে উঠলেও তাঁর মেয়েরা ছিলেন খুবই আন্তরিক। তাঁরা তাদের শান্তনা দিচ্ছিলেন, অভয় দিচ্ছিলেন। জার্মানীতে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

রেহানা বলেন, ‘পরে শোনেছি সানাউল হক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকেও টেলিফোন করে বলেছেন “এইসব ঝামেলা আপনি আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছেন, তারাতারি এই ঝামেলা সরান। আমরা বেড় হয়ে আসলাম সানাউল হকের বাড়ী থেকে।”

*হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফেরেশতার মত আর্ভিভূত হয়েছিলেন

রেহানা বলেন, ‘ব্রাসেলস ও জার্মানীর বোর্ডারে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আমাদের জন্যে গাড়ী পাঠালেন। আমরা সোজা ‘বন’ এ গিয়ে তাঁর বাসায় উঠি।’

শেখ রেহানা যখন এই স্মৃতিচারণ করছিলেন, তখন তাঁর চোখে মুখে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক উজ্বল আভা ফুটে ওঠে।

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

তিনি বলেন, ‘ঐসময় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর ভূমিকা আমরা দুবোন কোনদিন ভুলতে পারবো না। জনাব চৌধুরী তখন আমাদের জন্যে ফেরেশতার মত আর্ভিভূত হয়েছিলেন।’

রেহানা বলেন, ‘জনাব চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী দুজনই আমাদের শান্তনা দিচ্ছিলেন, দিচ্ছিলেন সাহস ও অভয়। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রীর চলাফেরা একটু অন্যরকম হলেও আমাদের মায়ের মত নিজের আচলের নিচে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি’।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আমরা মধ্যভিত্ত ঘরের সন্তান। ফরেন সার্ভিসের লোক হিসেবে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রীর হাই প্রোফাইল চলাফেরাও তাঁর আঁচলের আশ্রয় থেকে আমাদের বঞ্চিত করেনি’। তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে, এমনটাই জানালেন রেহানা।

তিনি বলেন, ‘কয়েকজন বাংলাদেশী ও পাকিস্তানী ছেলে বন এ হাইকমিশন ভবণ ঘেরাও করে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামানোর জন্যে জনাব চৌধুরীকে চাপ দেয়। আমাদের বেড় করে দিতেও বলে তাঁকে। হুমায়ুন রশীদে চৌধুরী তাদের চাপে নতি স্বীকার না করে উল্টো তাদের বলেন, ‘‘এই ভবণ এখনও বাংলাদেশ। ঢাকা থেকে আমি কোন নির্দেশ পাইনি। তোমরা যদি বেশি ঝামেলা করো আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো। ছেলেরা তখন চলে যায়’’।

রেহানা জানান, এরপর গুজব ছড়িয়ে পড়ে ক্ষমতা দখলকারী সরকারের নির্দেশে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী হাসিনা-রেহানাকে তাঁর বাসায় বন্দি করে রেখেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা তখন ভীড় জমায় জনাব চৌধুরীর বাসার সামনে। তাঁরা জানতে চায় আসলেই হাসিনা-রেহানা বন্দি কি না।

রেহানা বলেন, ‘হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তখন আমাদের এসে বলেন, ‘তোমারা কি একটু জানালার কাছে গিয়ে তোমাদের প্রকৃত অবস্থান জানাবে?’ আমরা সাথে সাথেই জানালার কাছে গিয়ে সাংবাদিকদের বললাম, আমরা এখানে আশ্রয় পেয়েছি, বন্দি নই। আমাদের কথা শোনে চলে যান সাংবাদিকরা।’

*সঠিক খবর পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে

কখন জানতে পারলেন আপনাদের পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ রেহানা বলেন, ‘আমরা দুবোন ছাড়া যে আমাদের পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই, এই খবরটি সঠিকভাবে পেতে আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। কেউই ঠিক মত বলতে পারছিলেন না ঢাকায় কি হয়েছে। লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে টেলিফোন আসছিল ‘বন’য়ে। ভিন্ন ভিন্ন খবর দিচ্ছিলেন অনেকে। কেউ বলছেন মা ও রাসেল বেঁচে আছেন। তাঁরা ঐদিন ছোট ফুফুর বাসায় ছিলেন। কেউ বলছেন জামাল ভাই সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার, তিনি ব্যারাকে ছিলেন এজন্যে বেঁচে গেছেন, আবার কেউ বলছেন কামাল ভাইয়ের ক্রিকেট টিম নিয়ে মালেয়শিয়া যাওয়ার কথা, তিনি সেখানে চলে গেছেন, ভাবী চলে গেছেন তাঁর বাবার বাসায়, সুতরাং তারা বেঁচে আছেন। কিন্তু কোন খবরই সঠিক ভাবে কেউ বলতে পারছিলেন না’।

*প্রেস কনফারেন্স করার অনুরোধ রাখলেন না ড: কামাল

রেহানা জানান ড: কামাল হোসেন ঐসময় জার্মানীতে আসেন। তিনিও খুব কান্নাকাটি করছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিনি তখন দেশের বাইরে সফরে ছিলেন।

ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর কাছেও সঠিক কোন খবর নেই। ড: কামাল হোসেনকে একটি প্রেস কনফারেন্স করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধু তনয়া বলেন, ‘কামাল হোসেন সাহেবকে বললাম, চাচা আপনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী, একটি প্রেসকনফারেন্স করে বিশ্ব মিডিয়াকে প্রকৃত অবস্থা একটু বলুন, আমাদের কুটনৈতিক মিশনগুলোকে ডিফেন্ড করতে অনুরোধ করুন। তিনি আমার অনুরোধের গুরুত্ব দিলেন না। হয়তো ছোট মানুষ হিসেবে এই অনুরোধের কোন গুরুত্ব নেই বলেই তিনি ভেবেছিলেন। তবে ঐ সময় যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রী কামাল হোসেন একটি প্রেস কনফারেন্স করতেন তখন পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো’।

*ঘটনার ৩/৪ মাস পর জানতে পারি কালো রাতের বিস্তারিত

পৃথিবীতে আপনাদের আর কেউ নেই, এই সঠিক খবরটি কখন পেলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে রেহানা জানান, অনেক পরে দিল্লীতে আসার পর তাঁরা জানতে পারেন তারা দুবোন ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই। ঘটনার ৩/৪ মাস পর শেখ সেলিম ও আবুল হাসনাথ আব্দুল্লারা যখন কলকাতা থেকে দিল্লীতে আসেন তখনই তাদের মুখে সেই কালোরাতের বিস্তারিত জানতে পারেন তাঁরা, রেহানা এমনটাই জানালেন তাঁর এক্সক্লুসিভ স্মৃতিচারণে।

তিনি বলেন, ‘অগাষ্টের ২৪/২৫ তারিখের দিকে আমরা ইন্ডিয়াতে চলে যাই। তখন প্লেইনে পত্রিকায় দেখলাম সব শেষ। মা, বাবা, ভাইবোন কেউ বেঁচে নেই আমাদের। এরপরও বিশ্বাস হচ্ছিলনা। কেন হবে এমন ঘটনা। পাকিস্তানীরা যেখানে এমন ঘটনা করতে পারেনি, বাঙালিরা কেন করবে। তখনও একটি আশা মনে ছিল হয়তো অনেকেই বেঁচে আছেন’।

তিনি বলেন, ‘এর আগে জার্মানীতে রেডক্রস বললো তাঁরা জানতে পেরেছে মা ও রাসেল বেঁচে আছেন। তাঁরা ছোট ফুফুর আশ্রয়ে তাঁর বাসায় আছে। রেডক্রস বললো তাঁরা যদি বেঁচে থাকেন তবে আমরা তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারবো। তোমরা ইন্ডিয়া থাকলে এই উদ্ধার প্রক্রিয়া চালাতে আমাদের সুবিধা হয়। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীও সায় দিলেন রেডক্রসের কথায়। আমরা চলে আসলাম ইন্ডিয়ায়’।

*মোশতাক ছুরি মারতে পারে, জানতেন বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছের লোক খোন্দকার মোশতাক ১৫ই আগষ্ট ঘটনার মূল নায়ক, এই খবর জানার পর কেমন ছিল তাঁর প্রতিক্রিয়া, শেখ রেহানার কাছে এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি’।

তিনি বলেন, ‘যারাই শতাব্দির এই ঘৃন্যতম হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিল, সবাইতো ছিল কাছের লোক’।

খোন্দকার মোশতাককে বঙ্গবন্ধু হয়তো চিনতেন এমন মন্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তনয়া একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘১৫ই আগষ্টের ঘটনার অনেক পর খোকা চাচা (বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই) একদিন বললেন, ‘‘জানিস, মিয়া ভাই খোন্দকার মোশতাককে ঠিকই চিনতেন। মোশতাকের হয়ে তাঁর কাছে একবার তদবিরে গিয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, খোকা তুই মোশতাকের জন্যে তদবির করতে এসেছিস। আমাকে যদি কেউ পেছন থেকে ছুরি মারে, তা মোশতাকই মারবে’’।

রেহানা বলেন, ‘এরপরও সহকর্মী বন্ধু বান্ধবদের প্রতি আব্বার ছিল অগাধ বিশ্বাস। কারো প্রতি তিনি বিশ্বাস হারাতেন না’।

রেহানা বলেন, ‘এমনও শোনেছি, ঘটনার রাতে ১২টা পর্যন্ত মোশতাক ৩২ নং এ ছিল। তাদের পরিকল্পিত ‘অভিযান’ সম্পর্কে কেউ কিছু আঁচ করতে পারছে কি না, তা অবজার্ভ করতে সে ছিল ঐখানে’।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে এই মোশতাক যখন জেলে, তখন তাঁর অসুস্থ্য স্ত্রীর সব দায় দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমার মা। তাঁকে সুস্থ করে তুলতে বিরামহীন চেষ্টা করেছেন তিনি’।

রেহানা বলেন, ‘আমার দাদির মৃত্যুর পর মোশতাকের সেই অস্বাভাবিক কান্না এখনও আমার চোখে ভাসে। আব্বাসহ আমরা সবাই ছিলাম শোকে কাতর। কিন্তু একমাত্র মোশতাকই তখন মাঠিতে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করেছে, যা অনেককেই অবাক করেছে। তখনতো আর বুঝতে পারিনি আব্বার বিশ্বাসে ঢুকতে এ ছিল তার অভিনয়’।

তিনি বলেন, ‘কি আর করা, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তো ব্রুটাস, মিরজাফরদের আবির্ভাব ঘটে, মোশতাকের আগমনও আমরা সেই ভাবেই দেখি’।

*তাজ উদ্দিন কাকার সাথে আব্বার কোন দুরত্ব ছিল না

মোশতাকের কারনেই তাজ উদ্দিনের সাথে বঙ্গবন্ধুর দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন, এবিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা বলেন, ‘তাজ উদ্দিন কাকার সাথে আসলে আব্বার কোন দুরত্ব ছিল না। এটি একটি প্রোপাগান্ডা। মনে প্রাণে তাঁরা দুজন ছিলেন একাত্ম’। ঐসময় রাজনীতির এত ভেতরে যাওয়ার বয়স ছিল না তাঁর এমন মন্তব্য করে শেখ রেহানা বলেন, ‘এরপরও যতটুকু দেখেছি আব্বা আর তাজ উদ্দিন কাকা ছিলেন এক প্রাণ, এক আত্মা’। খোন্দকার মোশতাক হয়তো তাদের মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে পারে মন্তব্য করে রেহানা বলেন, ‘যে লোক নিজের ত্রিশ বছরের বন্ধুকে ছুরি মারতে পারে, তাঁর জন্য এই অপচেষ্টা করা তো কোন বিষয়ই নয়’।

*মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ

৩০ বছরের বন্ধুর হাতে বাবা বঙ্গবন্ধুর এই নির্মম পরিণতি বর্তমানে বোন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট সহকর্মীদের সম্পর্কে তাঁর মধ্যে কোন বিশ্বাস সংকটের জন্ম দেয় কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রেহানা বলেন, ‘না, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বিশ্বাস তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। আমরা যদি সবার উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতাম তাহলে ১৫ই আগষ্টের পর তো দুবোন ঘরেই বন্দি হয়ে বসে থাকতাম’। তিনি বলেন, ‘কার ভেতরে কি আছে তা বলা মুশকিল হলেও সবার উপর থেকে বিশ্বাস তো আর হারানো যায় না। উপরওয়ালার কাছ থেকে যার যেদিন হুমুক আসবে, সেদিনই তাকে চলে যেতে হবে, এই নিয়তিতে আমরা বিশ্বাস করি’, এমনই মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর বেঁচে থাকা একমাত্র বোন শেখ রেহানার। বোন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্বা নিয়ে নিজের মধ্যে কোন শঙ্কা কাজ করে কি না, এ বিষয়টি জানতে চাইলে, এধরনের একটি শঙ্কা নিজের ভেতরে আছে বলে স্বীকার করেন শেখ রেহানা। তিনি বলেন, ‘বোন শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যে একুশে আগষ্টের হামলাসহ ২২ বার আক্রমন চেষ্টার পর এই শঙ্কা তো থাকবেই। সময় যখন ফুরাবে কেউই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। তবে মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারাতে চাইনা’।

4D38D2AC-7177-4F7D-8557-90639633858Bসত্যবাণী সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশার সাথে স্মৃতিচারণ করছেন শেখ রেহানা

*রাজনীতির প্রতি অনিহা জন্মেছিল

মা-বাবাসহ পুরো পরিবার হারানোর পর কখনও কি এমন মনে হয়েছে যে আার কোন রাজনীতি না, এমন প্রশ্ন করলে বঙ্গবন্ধু কন্যা জানান, হ্যা ঘটনার পর পর এমন মনোভাব তাঁরই ছিল সবচেয়ে বেশি। যে রাজনীতি ছোট্র বয়সে নিজেদের কাছ থেকে বাবাকে সব সময় বিচ্ছিন্ন করে রাখতো, সেই রাজনীতি যখন চীরতরে পুরো পরিবার ছিনিয়ে নিলো, তখন আর কিসের রাজনীতি , এমন মনোভাব নিজের ভেতরে কাজ করলেও এক পর্যায়ে এসে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে পুরো পরিবার নিয়ে গেলেও আল্লাহ কেন তাদের দুবোনকে বাঁচিয়ে রাখলেন? তিনি বলেন, ‘আমাদের বাঁচিয়ে রাখার পেছনে নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কোন উদ্দেশ্যে আছে’। বঙ্গবন্ধু তনয়া জানান, উপরোক্ত প্রশ্ন মনে উদিত হওয়ার পরই নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে হলো তাদের।

*আল্লার কাছে নিয়মিত ফরিয়াদ

তিনি বলেন, ‘বাবা-মার খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসতে শক্তি প্রার্থনা করে আল্লার কাছে নিয়মিত ফরিয়াদ করতাম। মনে হলো এই খুনিদের ধরার জন্যেই হয়তো আল্লাহ আমাদের দুবোনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন’। রেহানা বলেন, ‘ঘটনার পর পর এমনও হতো, অভিমান করে সৃষ্টিকর্তাকে বলতাম আমাকে নিয়ে কেন আমার ভাইদের বাঁচিয়ে রাখলে না। রাজনীতির কারনে আব্বার অনুপস্থিতির ফলে যে চাচার কাছে ছিল আমাদের সব আব্দার, সেই চাচাকেও বাঁচতে দিলো না ঘাতকরা। সবার আদরের ছোট্র ভাইটিকেও নির্মম ভাবে হত্যা করলো’।

*মৃত্যুই ডেকে এনেছে চাচাকে

চাচা শেখ নাসেরের কথা বলতে গিয়ে রেহানা বলেন, ‘নিয়তি যে দু ভাইকে আলাদা করতে চায়নি, তার প্রমান আমার চাচার মৃত্যু। ১৪ই আগষ্ট খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে চাচা প্লেনের সিড়িতে যখন উঠলেন, তখনই দুজন কর্মকর্তা গিয়ে তাকে বললেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট আপনাকে বাসায় ফিরে যেতে বলেছেন’’। চাচা বাসায় ফিরে যান। অনেকের সাথে বসা আব্বাকে গিয়ে বললেন ‘‘মিয়া ভাই আপনি নাকি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন’’? উত্তরে অট্রহাসি দিয়ে আব্বা বললেন ‘‘আমাকে ছেড়ে তুই চলে যেতে চেয়েছিলে, দেখ তোকে কিভাবে ফিরিয়ে আনলাম’’। রেহানা বলেন, ‘আসলে মৃত্যুই ডেকে এনেছিল চাচাকে’।

*বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিল জয় আর পুতুল

  ছেলে জয় ও মেয়ে পতুলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

সব হারিয়ে নিজেদের বেঁচে থাকার ইচ্ছেও হারিয়ে ফেলেছিলেন হাসিনা-রেহানা। তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল জয় আর পুতুল। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকতাম, খাওয়া দাওয়া কিছুই নেই। জয়-পুতুল যখন কেঁদে উঠতো তখন তাদের খাবার দিতে স্বাভাবিক হতে হতো আমাদের’। তিনি বলেন, ‘শুধুই আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতাম। দুলাভাইয়ের এক বন্ধু ড: শহীদ আমাদেরকে কিছু দোয়া লিখে দিয়ে বললেন, কান্নাকাটি না করে তোমরা এ দোয়াগুলো পড়তে থাকো। এই দোয়াগুলো পড়তে থাকলাম আমরা। আপাকে শান্তনা দেই আমি, আমাকে শান্তনা দেন আপা। এই আমাদের অবস্থা’। তিনি বলেন, ‘দেখেন আমাদের ধর্মটা কত প্রাকটিক্যাল। স্বজনের মৃত্যুর পর আত্মীয় স্বজনদের শান্তনা লাভে আমাদের ধর্ম কত পন্থা ঠিক করে দিয়েছে। আমরা শেষ যাত্রায় স্বজনের পাশে থাকি, দোয়া দুরুদ করি। দাফন কাফন শেষে কুলখানি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে আমরা আস্তে আস্তে শান্তনা পাই। কিন্তু আমাদের বেলায় এর কোন সুযোগই পাইনি আমরা দুবোন। যারা আমাদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো এরা কেমন মুসলমান?’-প্রশ্ন বঙ্গবন্ধু কন্যার।

*পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিরাপত্বা দিতে নারাজ

রেহানা জানান বাবা-মা’র খুনিদের বিচারের কাটগড়ায় নিয়ে আসার আশাই তাদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। ইন্ডিয়ায় আসার বেশ কিছুদিন পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করে একা একা ঘরে বসে থাকতে তাঁর অনিচ্ছার কথা জানান রেহানা। বলেন তিনি পড়াশোনা শুরু করতে চান। এরপর নেহরু ইউনিভার্সিটি, সীমলা ও কলকাতার শান্তি নিকেতনে তাঁর ভর্তির ব্যবস্থা হয় বলে বাংলানিউজকে জানান শেখ রেহানা। তিনি বলেন, ‘ভর্তির সব ব্যবস্থা হলো, কিন্তু পড়ায়তো মন বসে না। শান্তি নিকেতনে আসার জন্যে ট্রেনে উঠবো, এমন সময় খবর পেলাম পশ্চিম বঙ্গ সরকার বলছে আমার নিরাপত্বা দিতে পারবে না। আবার ফিরে আসলাম আপার কাছে’। নিরাপত্বার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় শান্তি নিকেতনে যেতে না পেরে লন্ডনে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন শেখ রেহানা, এমনটাই জানালেন তাঁর স্মৃতিচারণে। লন্ডনে তখন তাঁর এক চাচা ও ট্রেনিং এ আসা তাঁর ফুফা সাবেক আর্মি চীফ জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান অবস্থান করছিলেন। রেহানা বলেন, ‘ফুফা জেনারেল মোস্তাফিজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশে আর ফিরবেন না। কারন চাকুরীতে বিভিন্নভাবে তাঁকে হয়রানী করা হচ্ছিল। আমি তাঁকে একটি চিঠি লিখে অনুরোধ করি ‘‘ফুফা আপনাকে চাকুরীতে ফিরতে হবে। আমাদের অনেক কাজ বাকি, অভিমান করলে চলবে না। ১৫ই আগষ্টের খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসতে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে’’। ফুফা আমার কথা রাখলেন। আমার এই চিঠি এখনও আমার ফুফুর কাছে আছে’।

*ডটার অব লেইট শেখ মুজিবুর রহমান

রেহানা জানান, ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনে চলে আসেন তিনি। এর আগে দিল্লীতে ব্রিটিশ ভিসা সংগ্রহের কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে রেহানা বলেন, ‘একা একা বাসে করে ব্রিটিশ হাইকমিশনে গিয়ে ভিসার জন্যে এপ্লাই করি। সাতদিন পর আসতে বললে, হাইকমিশন ত্যাগ করে যখন বেড় হচ্ছি, ঠিক তখনই এক অফিসার এসে আমার কাছে জানতে চান, আমি শেখ মুজিবের মেয়ে কি না। উত্তরে হ্যা সূচক জবাব দিলে তিনি আমাকে ভেতরে নিয়ে একটি রুমে বসতে বললেন। কিছুক্ষন পর আরেক কর্মকর্তা, সম্ভবত ডেপুটি হাইকমিশনার এসে আমাকে দুয়েকটি প্রশ্ন করে চলে গেলেন’। বঙ্গবন্ধু কন্যা জানান, তাঁকে প্রশ্ন করে চলে যাওয়ার পরই আরেক কর্মকর্তা এসে তাঁকে পরদিন আসার জন্যে বললেন। পরদিন ভিসাসহ তাঁর হাতে পাসপোর্টটি যখন দেয়া হলো তখন তিনি দেখলেন ভিসার উপর লেখা ‘‘ডটার অব লেইট শেখ মুজিবুর রহমান’’। রেহানা বলেন, ‘এটি দেখে মনটা তখন ভরে গেলেও, তাৎক্ষনিক আবার খারাপ হয়ে যায় এই ভেবে যে, বিশ্বব্যাপী এত শ্রদ্ধেয় আমার বাবাকে মেরো ফেললো দেশেরই কয়টি কুলাঙ্গার’।

*বিমান টিকেটের জন্যে ধর্ণা

ভিসা হলেও লন্ডন যাওয়ার একটি টিকেটের জন্যেও অনেকের কাছে ধর্ণা দিতে হয়েছে তাঁকে, এমনটি জানিয়ে শেখ রেহানা বলেন, ‘একটি টিকেটের পয়সার জন্যে অনেককেই অনুরোধ করলাম, চিঠি লিখলাম। বললাম লন্ডনে এসে চাকুরী করে এই পয়সা শোধ করে দেবো। কিন্তু কেউই সাহায্যের হাত বাড়ালেন না’।

*মিসেস গান্ধীই ব্যবস্থা করে দেন

রেহানা বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বলতে হলো বিষয়টি। মিসেস গান্ধি তখন বললেন ‘‘কেন তোমি ইন্ডিয়া ছাড়বে, এখানেই লেখাপড়া করো’’। আমি তখন পশ্চিম বঙ্গ সরকার যে আমাকে নিরাপত্বা দিতে রাজি নয় এই বিষয়টি তাকে জানালাম। তিনি বিষয়টি জানতেন না। আমি তাকে বললাম লন্ডনেই আমি চলে যাই, সেখানে গেলে বিভিন্ন দিক থেকে আমার সুবিধা হবে’। রেহানা জানান, শেষ পর্যন্ত মিসেস গান্ধিই তাঁর জন্যে লন্ডনের একটি বিমান টিকেটের ব্যবস্থা করেন। লন্ডনে এসে তিনি উঠলেন তাঁর খোকা চাচার বাসায়, এমনটাই জানান রেহানা। তিনি বলেন, ‘লন্ডনে এসে গাফ্ফার চাচা, এম আর আখতার মুকুলসহ ২/১ জন মানুষের সাথেই মাত্র যোগাযোগ হয়। হন্যে হয়ে খুজতে থাকি চাকুরী। ১৫ই আগষ্টের হত্যাকান্ডের বিচারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করতে থাকি। সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটি চাকুরীর। এসময় টের পাই দায় দায়িত্ব এমন ভাবে এসে ভর করেছে আমার উপর, যা রাতারাতি আমাকে বড় করে তুলেছে। নিজেই নিজের অভিভাবক। লন্ডনে থাকার জায়গা নেই, আশ্রয় নেই, চাকুরীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছি, খোঁজ নেয়ার কেউ নেই আমার। আপাকে চিঠি লিখে মাঝে মাঝে পরামর্শ নেই’।

*মাথার উপর ছায়ার আশায় বিয়েতে মত

রেহানা বলেন, ‘এমনি পর্যায়ে যখন অনুভব করছিলাম আমার মাথার উপরে একটি ছায়া দরকার, ঠিক তখনই বিয়ের আলাপ আসে’। ড: শফিক সিদ্দিক তখন পড়াশোনার জন্যে লন্ডনে। রেহানা বলেন, ‘এই প্রস্তাব অবশ্য আব্বা বেঁচে থাকতেই নিয়ে এসেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জনাব জিল্লুর রহমান। কিন্তু তখন বড় ভাইদের বিয়ে হওয়ার পর আমার বিষয়ে আব্বা গুরুত্ব দেন নাই। বলেছেন পড়া লেখা শেষ হোক এরপর দেখা যাবে’। শেখ রেহানা জানান, একই প্রস্তাব যখন আবার আসলো তখন বোন শেখ হাসিনা তাঁর মতামতের উপরই ছেড়ে দিয়েছিলেন বিষয়টি। কিন্তু নিজের মাথার উপরে একটি ছায়ার আশায় বিয়ের প্রস্তাবটিতে সম্মতি দেন তিনি, এমনটাই জানালেন রেহানা। ৭৭ সালে তাদের বিয়ে হয়।

*আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আইনজীবিকে খুজতে থাকি

রেহানার মাথায় তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর ব্রিটিশ আইনজীবি স্যার থমাস উইলিয়ামের সাথে যোগাযোগের চিন্তা কাজ করছিল বলে জানান তিনি। উইলিয়ামকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি করার মনোবাসনা তখন তাঁর মনে। রেহানা বলেন, ‘লন্ডনে এসে বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্ত কমিটি গঠনের চেষ্টা করতে লাগলাম। নোবেল বিজয়ী শন ম্যাবক্রব্রাইট, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর মতিন চৌধুরী, গাফ্ফার চাচা, ড: কামাল হোসেনসহ অনেকের সাথে যোগাযোগ হলো। অনেক চেষ্টার পর সাক্ষাত পেলাম স্যার থমাস উইলিয়ামের। উনি তখন রানীর কুইন্স কাউন্সিলার হয়ে লর্ডস সভার সদস্য। আমি উনাকে চিনতাম। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন উনি যখন ঢাকায় গিয়েছিলেন আমি তখন তাঁকে চা নাস্তা করে খাইয়েছি। মার সাথে কথা বলার সময় পাশে বসে থাকতাম। থমাস উইলিয়ামও আমাকে দেখে চিনে ফেললেন। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘‘ দুর থেকে তোমাকে দেখে মনে হয়েছে বেগম মুজিব হেটে আসছেন’’। আমার সাথে তখন ড: সেলিমও ছিলেন। সৈয়দ আশরাফ ভাই যেতে পারেননি কি কারনে জানি। থমাস উইলিয়াম আমাদের সব ধরনের সাহায্য করতে রাজি হলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সব ধরনের সাহায্য করবো, কিন্তু নিজে কিছুতে থাকতে পারবো না। কারন আমি এখন কুইন্স কাউন্সিলার। তিনি আইনজীবিও ঠিক করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন’। রেহানা জানান, এরপর ৭৯ সালে তিনি সুইডেন যান। সেখানেই প্রথম শেখ হাসিনার নাম দিয়ে ব্যানার টাঙ্গিয়ে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেন। তিনি বলেন, ‘আমার তখন পাসপোর্ট নেই। আমার পাসপোর্ট এর আগেই কেড়ে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ব্রিটিশ সরকারের দেয়া একটি ট্রেভেলস ডকুমেন্টস নিয়ে যাই সুইডেন। এরপর আস্তে আস্তে সব এগুতে থাকে। আমরা ইন্টারন্যাশন্যাল মার্ডার এনকুয়ারী কমিটি করলাম। এখানে দুইজন আইনজীবি ঠিক করে দিলেন থমাস উইলিয়াম। এভরি রোজ নামের একজন সলিসিটরও ঠিক করে দিলেন তিনি। থমাস উইলিয়ামের একজন ছেলেও আইনজীবি হিসেবে সম্পৃক্ত হলেন কমিটিতে। আইনজীবিদের ঢাকা যাওয়ার টিকেটের পয়সা সংগ্রহ করা হলো প্রবাসী ভাইবোনদের কাছ থেকে। সাধ্যানুযায়ী সবাই দান করলেন এই তহবিলে। ঢাকায় রাজ্জাক ভাইরাও আনুসঙ্গিক সব কিছু ঠিক করে রাখলেন’।

*ভিসা না দিতে হাইকমিশন বন্ধ করে দেয়া হয়

রেহানা জানালেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ঢাকা যাওয়া হয়নি এই টিমের। আইনজীবিরা যেদিন ভিসার জন্যে হাইকমিশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন সেদিন পুরো হাইকমিশনই বন্ধ করে রাখা হয়, ভিসা দেয়াতো দুরের কথা। তিনি বলেন, ‘এটি হলো ৭৯ বা ৮০ সালের কথা’। তিনি জানান এরপরও হতাশ না হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্ত ও বিচারের দাবিতে তৎপরতা চালাতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘সুইডেন থেকে ফিরে আসার পর লন্ডনে আমার সাক্ষাত হলো মালেক উকিল, সামাদ আজাদ ও ড: কামাল হোসেন সাহেবের সাথে। তাদের সাথে নিয়ে আমি ওয়েষ্ট মিনিষ্টারের কাছে একটি রেষ্টুরেন্টে প্রেস কনফারেন্স করলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আতা খান সাহেবের রেষ্টুরেন্টে। ঐ প্রেস কনফারেন্সে আমি একটি লিখিত বক্তব্য রাখলাম। সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের জবাব দিলেন ড: কামাল হোসেন’। রেহানা জানান, এরপর ৮০ সালের দিকে শেখ হাসিনা যখন লন্ডন আসেন তখন পার্টি নেতাকর্মীসহ অনেকের সাথেই যোগাযোগ হয় তাদের। বিয়ের পর ৭৭ সালের শেষের দিকে লন্ডনে তাঁর প্রথম খোঁজ পান আওয়ামী লীগ নেতা গৌস খান, খালেদা দবির ও তৎকালীন ন্যাপ নেতা নিখিলেশ চক্রবর্তী, এমনটাই জানালেন শেখ রেহানা।

*বিচার দাবির ক্যাম্পেইন নিয়ে কত বিদ্রুপ

রেহানা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করে আমরা ক্যাম্পেইন শুরু করলাম। এই ক্যাম্পেইন নিয়েও কতজন যে কত বিদ্রুপ করলো। লন্ডনে আসার পর চাকুরীর জন্যে যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, তখন কত পরিচিতজনদের সাথে সাক্ষাত হয়, সবাই এড়িয়ে যেতে চায়। চাকুরী নিলাম একটি লাইব্রেরী ও পাবলিশার্স কোম্পানীতে। এরপর তো অনেক পথ পাড়ি দিলাম’।

*চেনা লোকজন চোখ ফিরিয়ে নিলো

রেহানা আরও বলেন, ‘আমাদের বাসায় রাত দিন আসা যাওয়া এমন ব্যক্তিও রাস্তায় দেখা হলে চোখ ফিরিয়ে নিত। অবশ্য কেউ কেউ সাহায্যও করেছেন। এরমধ্যে একজন শিপিং কর্পোরেশনের এক বড় অফিসার, এ জেড আহমেদ আমাকে খুবই সাহায্য করেছেন। আব্বার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারী রুহুল কুদ্দুস ও মঈনুল ইসলাম সাহেবও আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন নিয়মিত। রুহুল কুদ্দুস ও তাঁর স্ত্রী আমার বিয়ের সময় খাবার রান্না করেন। আর বিয়ের উকিল ছিলেন মঈনুল ইসলাম সাহেব। উনারা আমার মুরুব্বী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তখন। আরেকজন ভদ্রলোক ড: শহীদুল্লার নাতি মনসুরুল হক, তাঁকে আমরা হীরু মামা বলে ডাকি, তিনিও আমার জন্যে অনেক করেছেন। উনি এখনও বেঁচে আছেন, আমার সাথে এখনও যোগাযোগ আছে। এই হীরু মামার সাথে পথ চলতে আমার পরিচয়। হীরু মামা ও আহমেদ আঙ্কেল এই দুইজন আমার জন্যে অনেক করেছেন। আসলে এতিমের জন্যে আল্লাহই কাউ না কাউকে পাঠিয়ে দেন, এদুজন আমার জন্যে সেরখমই ছিলেন’। রেহানা বলেন ‘ঘটনা তো অনেক। এগুলো বলে শেষ করা যাবে না’।

Facebook Comments

সিলেট প্রতিদিন :: বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা ১৫ই আগষ্টের শোকাবহ ঘটনা নিয়ে সর্বপ্রথম নিজের কষ্ট ও অনুভূতি মিশ্রিত বিস্তারিত স্মৃতিচারণ করেছিলেন লন্ডন প্রবাসী বিশিষ্ট সাংবাদিক, লন্ডন থেকে প্রকাশিত সত্যবাণী পত্রিকার সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশার সাথে ২০১৩ সালের অাগষ্টে জাতীয় শোক দিবসকে সামনে রেখে। শেখ রেহানার দীর্ঘ স্মৃতিচারণটি ঐবছর জাতীয় শোক দিবসের আগের দিনই প্রথম প্রকাশিত হয় বাংলাদেশের একটি অনলাইন সংবাদমাধ্যমে।

স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা বলেছিলেন, ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগষ্ট জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকান্ড চেনা মানুষগুলোকে রাতারাতি বদলে দিয়েছিলো। বিষ্ময় প্রকাশ করে তিনি ঐদিন বলেন, ‘মানুষ যে এত দ্রুত বদলাতে পারে বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর তা প্রথম বুঝতে পারলাম।’

তাঁর মর্মস্পর্শী স্মৃতিচারণে বেড়িয়ে আসে ১৫ই আগষ্ট পরবর্তী অকথিত অধ্যায়ের অনেক অজানা ঘটনা। দীর্ঘ স্মৃতিচারণে ১৫ই আগষ্ট পরবর্তী নিজের সংগ্রামী জীবনের কথা যেমন তুলে ধরেন, তেমনি সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটও ঝানু রাজনীতিকের মত ফুটিয়ে তুলেন শেখ রেহানা।

এক্সক্লুসিভ স্মৃতিচারণে ফুটে উঠে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে খোন্দকার মোশতাক আহমদের বিশ্বাসঘাতকতার গল্প। তৎকালীন পররাষ্ট্র মন্ত্রী ড: কামাল হোসেনের বিদেশে সংবাদ সম্মেলন আয়োজনের অনিহা প্রকাশের ঘটনাও অকটপ বর্ণণা দেন তিনি। কথায় কথায় পরিবার হারানো দুবোনকে নিরাপত্বা দিতে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের অনিহা, ভারত থেকে লন্ডন যাওয়া, বঙ্গবন্ধুর খুনের ঘটনায় গঠিত আন্তর্জাতিক তদন্ত দলের আতুর ঘরেই মৃত্যু, এমন সব হৃদয়ছোঁয়া বিবরণই তুলে ধরেন তিনি। আর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন জার্মানীতে সেসময় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকারী হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীসহ আরও অনেকের প্রতি।

নিজের বিয়ে ও ব্যক্তি জীবন পর্বের অনেক না বলা কথাও এদিন নি:সংকোচে সত্যবাণী সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশাকে বলে দেন বঙ্গবন্ধু কন্যা।

সৈয়দ আনাস পাশার সাথে শেখ রেহানার সেই হৃদয়ছোঁয়া স্মৃতিচারণটি এবারের জাতীয় শোক দিবসে সিলেটপ্রতিদিনের পাঠকদের জন্য প্রকাশ করা হলো।

স্মৃতিচারণের ছবি তুলেছেন তৎকালীন সময়ের ১৩ বছরের কিশোর নাহিয়ান পাশা।

শেখ হাসিনা ও ড. ওয়াজেদ মিয়ার বিয়ের ছবি

দীর্ঘ স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা জানান, ১৫ই আগষ্ট কালোরাতের হত্যাকান্ডের সময় বোন শেখ হাসিনা পরিবারের সাথে তিনি ব্রাসেলসে অবস্থান করছিলেন। দুলাভাই ড: ওয়াজেদ মিয়া তখন জার্মানীর কার্লসওয়েতে বসবাস করতেন। স্বামীর সাথে স্থায়ীভাবে বসবাসের জন্যে বোন শেখ হাসিনা যখন জুলাই মাসের শেষের দিকে জার্মানীতে আসেন, তখন তাঁর সাথে বেড়াতে আসেন তিনি। ১৫ই আগষ্ট তাঁরা ব্রাসেলসে ছিলেন, এমনটি জানিয়ে রেহানা বলেন, দুলাভাইয়ের ছুটিতে আমরা বেড়াতে আসি ব্রাসেলসে। উঠি ব্রাসেলসে নিযুক্ত বাংলাদেশের তৎকালীন রাষ্ট্রদূত সানাউল হকের বাসায়’।

*সারা জীবন কাঁদতে হতে পারে

এক্সক্লুসিভ স্মৃতিচারণে শেখ রেহানা বলেন, ‘আমার বয়সী সানাউল হকের মেয়েদের সাথে ঐ রাতে জমিয়ে আড্ডা দিচ্ছিলাম আমি। আমাদের উচ্ছলতা ও হাসাহাসির তীব্র শব্দে দুলাভাই এক পর্যায়ে এসে ধমক দিলেন আমাকে। বললেন, এত হাসাহাসি ভালো নয়, এতে সারা জীবন কাঁদতে হতে পারে’।

শেখ রেহানা বলেন, ‘দুলাভাই যত বলেন, আমরা তত আরও বেশি হাসাহাসি করি’। তাঁর চোখ ছল ছল করা মন্তব্য, ‘মাত্র কয়েক ঘন্টা পরেই যে আমার এই হাসি চীরতরে বন্ধ হয়ে যাবে, তা তখন কল্পনাই করতে পারিনি।’

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘১৫ই আগষ্ট ভোরে আপার ডাকে ঘুম ভাঙ্গে। তিনি বললেন, তাড়াতাড়ি ওঠো, ঢাকায় গোলমাল হয়েছে। গোলমাল, রাজনীতির কারণে আব্বার জেলে যাওয়া ইত্যাদি বিষয়গুলো স্বাধীনতার আগে আমাদের জন্যে ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা হলেও, এই গোলমাল যে সেই ‘স্বাভাবিক’ ঘটনা নয়, তা বুঝতে অবশ্য আমাদের আরও অনেক সময় অপেক্ষা করতে হয়েছে’।

*আগের দিন খাতির, পরদিন বোঝা

বঙ্গবন্ধু তনয়া বলেন, আগের দিন রাষ্ট্রদূত সানাউল হক সাহেবের বাসায় এসে উঠেছি। আমরা প্রেসিডেন্টের মেয়ে, খাতির যত্নের কি বাহার। পরদিন পৃথিবীতে আমাদের কেউ নেই। নিস্ব অসহায় আমরা দুটো বোন তখন সানাউল হক সাহেবের কাছে বোঝা হিসেবে পরিণত হলাম। আমাদের সরিয়ে দিতে তিনি অস্থির হয়ে উঠলেন।’

রেহানা জানান, সানাউল হক নার্ভাস হয়ে তাদের সরিয়ে দিতে অস্থির হয়ে উঠলেও তাঁর মেয়েরা ছিলেন খুবই আন্তরিক। তাঁরা তাদের শান্তনা দিচ্ছিলেন, অভয় দিচ্ছিলেন। জার্মানীতে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তখন বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত।

রেহানা বলেন, ‘পরে শোনেছি সানাউল হক হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকেও টেলিফোন করে বলেছেন “এইসব ঝামেলা আপনি আমার উপর চাপিয়ে দিয়েছেন, তারাতারি এই ঝামেলা সরান। আমরা বেড় হয়ে আসলাম সানাউল হকের বাড়ী থেকে।”

*হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ফেরেশতার মত আর্ভিভূত হয়েছিলেন

রেহানা বলেন, ‘ব্রাসেলস ও জার্মানীর বোর্ডারে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী আমাদের জন্যে গাড়ী পাঠালেন। আমরা সোজা ‘বন’ এ গিয়ে তাঁর বাসায় উঠি।’

শেখ রেহানা যখন এই স্মৃতিচারণ করছিলেন, তখন তাঁর চোখে মুখে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর প্রতি শ্রদ্ধাবোধের এক উজ্বল আভা ফুটে ওঠে।

হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী

তিনি বলেন, ‘ঐসময় হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রীর ভূমিকা আমরা দুবোন কোনদিন ভুলতে পারবো না। জনাব চৌধুরী তখন আমাদের জন্যে ফেরেশতার মত আর্ভিভূত হয়েছিলেন।’

রেহানা বলেন, ‘জনাব চৌধুরী ও তাঁর স্ত্রী দুজনই আমাদের শান্তনা দিচ্ছিলেন, দিচ্ছিলেন সাহস ও অভয়। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রীর চলাফেরা একটু অন্যরকম হলেও আমাদের মায়ের মত নিজের আচলের নিচে আশ্রয় দিয়েছিলেন তিনি’।

বঙ্গবন্ধু কন্যা বলেন, ‘আমরা মধ্যভিত্ত ঘরের সন্তান। ফরেন সার্ভিসের লোক হিসেবে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীর স্ত্রীর হাই প্রোফাইল চলাফেরাও তাঁর আঁচলের আশ্রয় থেকে আমাদের বঞ্চিত করেনি’। তাদের আশ্রয় দিতে গিয়ে ঝামেলাও পোহাতে হয়েছে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীকে, এমনটাই জানালেন রেহানা।

তিনি বলেন, ‘কয়েকজন বাংলাদেশী ও পাকিস্তানী ছেলে বন এ হাইকমিশন ভবণ ঘেরাও করে বঙ্গবন্ধুর ছবি নামানোর জন্যে জনাব চৌধুরীকে চাপ দেয়। আমাদের বেড় করে দিতেও বলে তাঁকে। হুমায়ুন রশীদে চৌধুরী তাদের চাপে নতি স্বীকার না করে উল্টো তাদের বলেন, ‘‘এই ভবণ এখনও বাংলাদেশ। ঢাকা থেকে আমি কোন নির্দেশ পাইনি। তোমরা যদি বেশি ঝামেলা করো আমি পুলিশ ডাকতে বাধ্য হবো। ছেলেরা তখন চলে যায়’’।

রেহানা জানান, এরপর গুজব ছড়িয়ে পড়ে ক্ষমতা দখলকারী সরকারের নির্দেশে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী হাসিনা-রেহানাকে তাঁর বাসায় বন্দি করে রেখেছেন। বিশ্বের বিভিন্ন মিডিয়ার সাংবাদিকরা তখন ভীড় জমায় জনাব চৌধুরীর বাসার সামনে। তাঁরা জানতে চায় আসলেই হাসিনা-রেহানা বন্দি কি না।

রেহানা বলেন, ‘হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী তখন আমাদের এসে বলেন, ‘তোমারা কি একটু জানালার কাছে গিয়ে তোমাদের প্রকৃত অবস্থান জানাবে?’ আমরা সাথে সাথেই জানালার কাছে গিয়ে সাংবাদিকদের বললাম, আমরা এখানে আশ্রয় পেয়েছি, বন্দি নই। আমাদের কথা শোনে চলে যান সাংবাদিকরা।’

*সঠিক খবর পেতে অপেক্ষা করতে হয়েছে

কখন জানতে পারলেন আপনাদের পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই, এমন প্রশ্নের জবাবে শেখ রেহানা বলেন, ‘আমরা দুবোন ছাড়া যে আমাদের পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই, এই খবরটি সঠিকভাবে পেতে আমাদের অনেক অপেক্ষা করতে হয়েছে। কেউই ঠিক মত বলতে পারছিলেন না ঢাকায় কি হয়েছে। লন্ডনসহ বিভিন্ন স্থান থেকে টেলিফোন আসছিল ‘বন’য়ে। ভিন্ন ভিন্ন খবর দিচ্ছিলেন অনেকে। কেউ বলছেন মা ও রাসেল বেঁচে আছেন। তাঁরা ঐদিন ছোট ফুফুর বাসায় ছিলেন। কেউ বলছেন জামাল ভাই সদ্য নিয়োগপ্রাপ্ত আর্মি অফিসার, তিনি ব্যারাকে ছিলেন এজন্যে বেঁচে গেছেন, আবার কেউ বলছেন কামাল ভাইয়ের ক্রিকেট টিম নিয়ে মালেয়শিয়া যাওয়ার কথা, তিনি সেখানে চলে গেছেন, ভাবী চলে গেছেন তাঁর বাবার বাসায়, সুতরাং তারা বেঁচে আছেন। কিন্তু কোন খবরই সঠিক ভাবে কেউ বলতে পারছিলেন না’।

*প্রেস কনফারেন্স করার অনুরোধ রাখলেন না ড: কামাল

রেহানা জানান ড: কামাল হোসেন ঐসময় জার্মানীতে আসেন। তিনিও খুব কান্নাকাটি করছিলেন। বঙ্গবন্ধু সরকারের পররাষ্ট্র মন্ত্রী হিসেবে তিনি তখন দেশের বাইরে সফরে ছিলেন।

ঢাকার পরিস্থিতি নিয়ে তাঁর কাছেও সঠিক কোন খবর নেই। ড: কামাল হোসেনকে একটি প্রেস কনফারেন্স করার অনুরোধ জানিয়েছিলেন মন্তব্য করে বঙ্গবন্ধু তনয়া বলেন, ‘কামাল হোসেন সাহেবকে বললাম, চাচা আপনি পররাষ্ট্র মন্ত্রী, একটি প্রেসকনফারেন্স করে বিশ্ব মিডিয়াকে প্রকৃত অবস্থা একটু বলুন, আমাদের কুটনৈতিক মিশনগুলোকে ডিফেন্ড করতে অনুরোধ করুন। তিনি আমার অনুরোধের গুরুত্ব দিলেন না। হয়তো ছোট মানুষ হিসেবে এই অনুরোধের কোন গুরুত্ব নেই বলেই তিনি ভেবেছিলেন। তবে ঐ সময় যদি পররাষ্ট্র মন্ত্রী কামাল হোসেন একটি প্রেস কনফারেন্স করতেন তখন পরিস্থিতি হয়তো অন্যরকম হতো’।

*ঘটনার ৩/৪ মাস পর জানতে পারি কালো রাতের বিস্তারিত

পৃথিবীতে আপনাদের আর কেউ নেই, এই সঠিক খবরটি কখন পেলেন, এমন প্রশ্নের উত্তরে রেহানা জানান, অনেক পরে দিল্লীতে আসার পর তাঁরা জানতে পারেন তারা দুবোন ছাড়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের আর কেউই বেঁচে নেই। ঘটনার ৩/৪ মাস পর শেখ সেলিম ও আবুল হাসনাথ আব্দুল্লারা যখন কলকাতা থেকে দিল্লীতে আসেন তখনই তাদের মুখে সেই কালোরাতের বিস্তারিত জানতে পারেন তাঁরা, রেহানা এমনটাই জানালেন তাঁর এক্সক্লুসিভ স্মৃতিচারণে।

তিনি বলেন, ‘অগাষ্টের ২৪/২৫ তারিখের দিকে আমরা ইন্ডিয়াতে চলে যাই। তখন প্লেইনে পত্রিকায় দেখলাম সব শেষ। মা, বাবা, ভাইবোন কেউ বেঁচে নেই আমাদের। এরপরও বিশ্বাস হচ্ছিলনা। কেন হবে এমন ঘটনা। পাকিস্তানীরা যেখানে এমন ঘটনা করতে পারেনি, বাঙালিরা কেন করবে। তখনও একটি আশা মনে ছিল হয়তো অনেকেই বেঁচে আছেন’।

তিনি বলেন, ‘এর আগে জার্মানীতে রেডক্রস বললো তাঁরা জানতে পেরেছে মা ও রাসেল বেঁচে আছেন। তাঁরা ছোট ফুফুর আশ্রয়ে তাঁর বাসায় আছে। রেডক্রস বললো তাঁরা যদি বেঁচে থাকেন তবে আমরা তাদের উদ্ধার করে নিয়ে আসতে পারবো। তোমরা ইন্ডিয়া থাকলে এই উদ্ধার প্রক্রিয়া চালাতে আমাদের সুবিধা হয়। হুমায়ুন রশীদ চৌধুরীও সায় দিলেন রেডক্রসের কথায়। আমরা চলে আসলাম ইন্ডিয়ায়’।

*মোশতাক ছুরি মারতে পারে, জানতেন বঙ্গবন্ধু

বঙ্গবন্ধুর সবচেয়ে কাছের লোক খোন্দকার মোশতাক ১৫ই আগষ্ট ঘটনার মূল নায়ক, এই খবর জানার পর কেমন ছিল তাঁর প্রতিক্রিয়া, শেখ রেহানার কাছে এমনটি জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘প্রথমে বিশ্বাস করতে পারিনি’।

তিনি বলেন, ‘যারাই শতাব্দির এই ঘৃন্যতম হত্যাকান্ডের সাথে জড়িত ছিল, সবাইতো ছিল কাছের লোক’।

খোন্দকার মোশতাককে বঙ্গবন্ধু হয়তো চিনতেন এমন মন্তব্যের মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু তনয়া একটি ঘটনা উল্লেখ করে বলেন, ‘১৫ই আগষ্টের ঘটনার অনেক পর খোকা চাচা (বঙ্গবন্ধুর ফুফাতো ভাই) একদিন বললেন, ‘‘জানিস, মিয়া ভাই খোন্দকার মোশতাককে ঠিকই চিনতেন। মোশতাকের হয়ে তাঁর কাছে একবার তদবিরে গিয়েছিলাম।

তিনি বলেছিলেন, খোকা তুই মোশতাকের জন্যে তদবির করতে এসেছিস। আমাকে যদি কেউ পেছন থেকে ছুরি মারে, তা মোশতাকই মারবে’’।

রেহানা বলেন, ‘এরপরও সহকর্মী বন্ধু বান্ধবদের প্রতি আব্বার ছিল অগাধ বিশ্বাস। কারো প্রতি তিনি বিশ্বাস হারাতেন না’।

রেহানা বলেন, ‘এমনও শোনেছি, ঘটনার রাতে ১২টা পর্যন্ত মোশতাক ৩২ নং এ ছিল। তাদের পরিকল্পিত ‘অভিযান’ সম্পর্কে কেউ কিছু আঁচ করতে পারছে কি না, তা অবজার্ভ করতে সে ছিল ঐখানে’।

তিনি বলেন, ‘স্বাধীনতার আগে এই মোশতাক যখন জেলে, তখন তাঁর অসুস্থ্য স্ত্রীর সব দায় দায়িত্ব নিয়েছিলেন আমার মা। তাঁকে সুস্থ করে তুলতে বিরামহীন চেষ্টা করেছেন তিনি’।

রেহানা বলেন, ‘আমার দাদির মৃত্যুর পর মোশতাকের সেই অস্বাভাবিক কান্না এখনও আমার চোখে ভাসে। আব্বাসহ আমরা সবাই ছিলাম শোকে কাতর। কিন্তু একমাত্র মোশতাকই তখন মাঠিতে গড়াগড়ি করে কান্নাকাটি করেছে, যা অনেককেই অবাক করেছে। তখনতো আর বুঝতে পারিনি আব্বার বিশ্বাসে ঢুকতে এ ছিল তার অভিনয়’।

তিনি বলেন, ‘কি আর করা, ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে তো ব্রুটাস, মিরজাফরদের আবির্ভাব ঘটে, মোশতাকের আগমনও আমরা সেই ভাবেই দেখি’।

*তাজ উদ্দিন কাকার সাথে আব্বার কোন দুরত্ব ছিল না

মোশতাকের কারনেই তাজ উদ্দিনের সাথে বঙ্গবন্ধুর দুরত্ব সৃষ্টি হয়েছিল বলে অনেকে মনে করেন, এবিষয়ে তাঁর মন্তব্য জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ রেহানা বলেন, ‘তাজ উদ্দিন কাকার সাথে আসলে আব্বার কোন দুরত্ব ছিল না। এটি একটি প্রোপাগান্ডা। মনে প্রাণে তাঁরা দুজন ছিলেন একাত্ম’। ঐসময় রাজনীতির এত ভেতরে যাওয়ার বয়স ছিল না তাঁর এমন মন্তব্য করে শেখ রেহানা বলেন, ‘এরপরও যতটুকু দেখেছি আব্বা আর তাজ উদ্দিন কাকা ছিলেন এক প্রাণ, এক আত্মা’। খোন্দকার মোশতাক হয়তো তাদের মধ্যে দুরত্ব সৃষ্টির অপচেষ্টা করতে পারে মন্তব্য করে রেহানা বলেন, ‘যে লোক নিজের ত্রিশ বছরের বন্ধুকে ছুরি মারতে পারে, তাঁর জন্য এই অপচেষ্টা করা তো কোন বিষয়ই নয়’।

*মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ

৩০ বছরের বন্ধুর হাতে বাবা বঙ্গবন্ধুর এই নির্মম পরিণতি বর্তমানে বোন শেখ হাসিনার ঘনিষ্ট সহকর্মীদের সম্পর্কে তাঁর মধ্যে কোন বিশ্বাস সংকটের জন্ম দেয় কি না, এমন এক প্রশ্নের জবাবে শেখ রেহানা বলেন, ‘না, মানুষের উপর বিশ্বাস হারানো পাপ। বিশ্বাস তো কাউকে না কাউকে করতেই হবে। আমরা যদি সবার উপর বিশ্বাস হারিয়ে ফেলতাম তাহলে ১৫ই আগষ্টের পর তো দুবোন ঘরেই বন্দি হয়ে বসে থাকতাম’। তিনি বলেন, ‘কার ভেতরে কি আছে তা বলা মুশকিল হলেও সবার উপর থেকে বিশ্বাস তো আর হারানো যায় না। উপরওয়ালার কাছ থেকে যার যেদিন হুমুক আসবে, সেদিনই তাকে চলে যেতে হবে, এই নিয়তিতে আমরা বিশ্বাস করি’, এমনই মন্তব্য প্রধানমন্ত্রীর বেঁচে থাকা একমাত্র বোন শেখ রেহানার। বোন প্রধানমন্ত্রীর নিরাপত্বা নিয়ে নিজের মধ্যে কোন শঙ্কা কাজ করে কি না, এ বিষয়টি জানতে চাইলে, এধরনের একটি শঙ্কা নিজের ভেতরে আছে বলে স্বীকার করেন শেখ রেহানা। তিনি বলেন, ‘বোন শেখ হাসিনাকে হত্যার জন্যে একুশে আগষ্টের হামলাসহ ২২ বার আক্রমন চেষ্টার পর এই শঙ্কা তো থাকবেই। সময় যখন ফুরাবে কেউই আমাদের রক্ষা করতে পারবে না। তবে মানুষের উপর থেকে বিশ্বাস হারাতে চাইনা’।

4D38D2AC-7177-4F7D-8557-90639633858Bসত্যবাণী সম্পাদক সৈয়দ আনাস পাশার সাথে স্মৃতিচারণ করছেন শেখ রেহানা

*রাজনীতির প্রতি অনিহা জন্মেছিল

মা-বাবাসহ পুরো পরিবার হারানোর পর কখনও কি এমন মনে হয়েছে যে আার কোন রাজনীতি না, এমন প্রশ্ন করলে বঙ্গবন্ধু কন্যা জানান, হ্যা ঘটনার পর পর এমন মনোভাব তাঁরই ছিল সবচেয়ে বেশি। যে রাজনীতি ছোট্র বয়সে নিজেদের কাছ থেকে বাবাকে সব সময় বিচ্ছিন্ন করে রাখতো, সেই রাজনীতি যখন চীরতরে পুরো পরিবার ছিনিয়ে নিলো, তখন আর কিসের রাজনীতি , এমন মনোভাব নিজের ভেতরে কাজ করলেও এক পর্যায়ে এসে তাঁর মনে প্রশ্ন জেগেছে পুরো পরিবার নিয়ে গেলেও আল্লাহ কেন তাদের দুবোনকে বাঁচিয়ে রাখলেন? তিনি বলেন, ‘আমাদের বাঁচিয়ে রাখার পেছনে নিশ্চয়ই সৃষ্টিকর্তার কোন উদ্দেশ্যে আছে’। বঙ্গবন্ধু তনয়া জানান, উপরোক্ত প্রশ্ন মনে উদিত হওয়ার পরই নতুন করে বাঁচতে ইচ্ছে হলো তাদের।

*আল্লার কাছে নিয়মিত ফরিয়াদ

তিনি বলেন, ‘বাবা-মার খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসতে শক্তি প্রার্থনা করে আল্লার কাছে নিয়মিত ফরিয়াদ করতাম। মনে হলো এই খুনিদের ধরার জন্যেই হয়তো আল্লাহ আমাদের দুবোনকে বাঁচিয়ে রেখেছেন’। রেহানা বলেন, ‘ঘটনার পর পর এমনও হতো, অভিমান করে সৃষ্টিকর্তাকে বলতাম আমাকে নিয়ে কেন আমার ভাইদের বাঁচিয়ে রাখলে না। রাজনীতির কারনে আব্বার অনুপস্থিতির ফলে যে চাচার কাছে ছিল আমাদের সব আব্দার, সেই চাচাকেও বাঁচতে দিলো না ঘাতকরা। সবার আদরের ছোট্র ভাইটিকেও নির্মম ভাবে হত্যা করলো’।

*মৃত্যুই ডেকে এনেছে চাচাকে

চাচা শেখ নাসেরের কথা বলতে গিয়ে রেহানা বলেন, ‘নিয়তি যে দু ভাইকে আলাদা করতে চায়নি, তার প্রমান আমার চাচার মৃত্যু। ১৪ই আগষ্ট খুলনার উদ্দেশ্যে রওয়ানা দিয়ে চাচা প্লেনের সিড়িতে যখন উঠলেন, তখনই দুজন কর্মকর্তা গিয়ে তাকে বললেন, ‘‘প্রেসিডেন্ট আপনাকে বাসায় ফিরে যেতে বলেছেন’’। চাচা বাসায় ফিরে যান। অনেকের সাথে বসা আব্বাকে গিয়ে বললেন ‘‘মিয়া ভাই আপনি নাকি আমাকে ডেকে পাঠিয়েছেন’’? উত্তরে অট্রহাসি দিয়ে আব্বা বললেন ‘‘আমাকে ছেড়ে তুই চলে যেতে চেয়েছিলে, দেখ তোকে কিভাবে ফিরিয়ে আনলাম’’। রেহানা বলেন, ‘আসলে মৃত্যুই ডেকে এনেছিল চাচাকে’।

*বেঁচে থাকার অবলম্বন ছিল জয় আর পুতুল

  ছেলে জয় ও মেয়ে পতুলের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী

সব হারিয়ে নিজেদের বেঁচে থাকার ইচ্ছেও হারিয়ে ফেলেছিলেন হাসিনা-রেহানা। তিনি বলেন, ‘বেঁচে থাকার একমাত্র অবলম্বন ছিল জয় আর পুতুল। সারাদিন বিছানায় পড়ে থাকতাম, খাওয়া দাওয়া কিছুই নেই। জয়-পুতুল যখন কেঁদে উঠতো তখন তাদের খাবার দিতে স্বাভাবিক হতে হতো আমাদের’। তিনি বলেন, ‘শুধুই আল্লাহর কাছে কান্নাকাটি করতাম। দুলাভাইয়ের এক বন্ধু ড: শহীদ আমাদেরকে কিছু দোয়া লিখে দিয়ে বললেন, কান্নাকাটি না করে তোমরা এ দোয়াগুলো পড়তে থাকো। এই দোয়াগুলো পড়তে থাকলাম আমরা। আপাকে শান্তনা দেই আমি, আমাকে শান্তনা দেন আপা। এই আমাদের অবস্থা’। তিনি বলেন, ‘দেখেন আমাদের ধর্মটা কত প্রাকটিক্যাল। স্বজনের মৃত্যুর পর আত্মীয় স্বজনদের শান্তনা লাভে আমাদের ধর্ম কত পন্থা ঠিক করে দিয়েছে। আমরা শেষ যাত্রায় স্বজনের পাশে থাকি, দোয়া দুরুদ করি। দাফন কাফন শেষে কুলখানি ইত্যাদি। পর্যায়ক্রমে আমরা আস্তে আস্তে শান্তনা পাই। কিন্তু আমাদের বেলায় এর কোন সুযোগই পাইনি আমরা দুবোন। যারা আমাদের এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করলো এরা কেমন মুসলমান?’-প্রশ্ন বঙ্গবন্ধু কন্যার।

*পশ্চিমবঙ্গ সরকার নিরাপত্বা দিতে নারাজ

রেহানা জানান বাবা-মা’র খুনিদের বিচারের কাটগড়ায় নিয়ে আসার আশাই তাদের নতুন করে বাঁচার স্বপ্ন দেখায়। ইন্ডিয়ায় আসার বেশ কিছুদিন পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী মিসেস ইন্দিরা গান্ধীর সাথে দেখা করে একা একা ঘরে বসে থাকতে তাঁর অনিচ্ছার কথা জানান রেহানা। বলেন তিনি পড়াশোনা শুরু করতে চান। এরপর নেহরু ইউনিভার্সিটি, সীমলা ও কলকাতার শান্তি নিকেতনে তাঁর ভর্তির ব্যবস্থা হয় বলে বাংলানিউজকে জানান শেখ রেহানা। তিনি বলেন, ‘ভর্তির সব ব্যবস্থা হলো, কিন্তু পড়ায়তো মন বসে না। শান্তি নিকেতনে আসার জন্যে ট্রেনে উঠবো, এমন সময় খবর পেলাম পশ্চিম বঙ্গ সরকার বলছে আমার নিরাপত্বা দিতে পারবে না। আবার ফিরে আসলাম আপার কাছে’। নিরাপত্বার নিশ্চয়তা না পাওয়ায় শান্তি নিকেতনে যেতে না পেরে লন্ডনে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেন শেখ রেহানা, এমনটাই জানালেন তাঁর স্মৃতিচারণে। লন্ডনে তখন তাঁর এক চাচা ও ট্রেনিং এ আসা তাঁর ফুফা সাবেক আর্মি চীফ জেনারেল মুস্তাফিজুর রহমান অবস্থান করছিলেন। রেহানা বলেন, ‘ফুফা জেনারেল মোস্তাফিজ সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন দেশে আর ফিরবেন না। কারন চাকুরীতে বিভিন্নভাবে তাঁকে হয়রানী করা হচ্ছিল। আমি তাঁকে একটি চিঠি লিখে অনুরোধ করি ‘‘ফুফা আপনাকে চাকুরীতে ফিরতে হবে। আমাদের অনেক কাজ বাকি, অভিমান করলে চলবে না। ১৫ই আগষ্টের খুনিদের বিচারের কাঠগড়ায় নিয়ে আসতে আমাদের অনেক কাজ করতে হবে’’। ফুফা আমার কথা রাখলেন। আমার এই চিঠি এখনও আমার ফুফুর কাছে আছে’।

*ডটার অব লেইট শেখ মুজিবুর রহমান

রেহানা জানান, ১৯৭৬ সালের ডিসেম্বর মাসে লন্ডনে চলে আসেন তিনি। এর আগে দিল্লীতে ব্রিটিশ ভিসা সংগ্রহের কষ্টের কথা জানাতে গিয়ে রেহানা বলেন, ‘একা একা বাসে করে ব্রিটিশ হাইকমিশনে গিয়ে ভিসার জন্যে এপ্লাই করি। সাতদিন পর আসতে বললে, হাইকমিশন ত্যাগ করে যখন বেড় হচ্ছি, ঠিক তখনই এক অফিসার এসে আমার কাছে জানতে চান, আমি শেখ মুজিবের মেয়ে কি না। উত্তরে হ্যা সূচক জবাব দিলে তিনি আমাকে ভেতরে নিয়ে একটি রুমে বসতে বললেন। কিছুক্ষন পর আরেক কর্মকর্তা, সম্ভবত ডেপুটি হাইকমিশনার এসে আমাকে দুয়েকটি প্রশ্ন করে চলে গেলেন’। বঙ্গবন্ধু কন্যা জানান, তাঁকে প্রশ্ন করে চলে যাওয়ার পরই আরেক কর্মকর্তা এসে তাঁকে পরদিন আসার জন্যে বললেন। পরদিন ভিসাসহ তাঁর হাতে পাসপোর্টটি যখন দেয়া হলো তখন তিনি দেখলেন ভিসার উপর লেখা ‘‘ডটার অব লেইট শেখ মুজিবুর রহমান’’। রেহানা বলেন, ‘এটি দেখে মনটা তখন ভরে গেলেও, তাৎক্ষনিক আবার খারাপ হয়ে যায় এই ভেবে যে, বিশ্বব্যাপী এত শ্রদ্ধেয় আমার বাবাকে মেরো ফেললো দেশেরই কয়টি কুলাঙ্গার’।

*বিমান টিকেটের জন্যে ধর্ণা

ভিসা হলেও লন্ডন যাওয়ার একটি টিকেটের জন্যেও অনেকের কাছে ধর্ণা দিতে হয়েছে তাঁকে, এমনটি জানিয়ে শেখ রেহানা বলেন, ‘একটি টিকেটের পয়সার জন্যে অনেককেই অনুরোধ করলাম, চিঠি লিখলাম। বললাম লন্ডনে এসে চাকুরী করে এই পয়সা শোধ করে দেবো। কিন্তু কেউই সাহায্যের হাত বাড়ালেন না’।

*মিসেস গান্ধীই ব্যবস্থা করে দেন

রেহানা বলেন, ‘শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর কাছে বলতে হলো বিষয়টি। মিসেস গান্ধি তখন বললেন ‘‘কেন তোমি ইন্ডিয়া ছাড়বে, এখানেই লেখাপড়া করো’’। আমি তখন পশ্চিম বঙ্গ সরকার যে আমাকে নিরাপত্বা দিতে রাজি নয় এই বিষয়টি তাকে জানালাম। তিনি বিষয়টি জানতেন না। আমি তাকে বললাম লন্ডনেই আমি চলে যাই, সেখানে গেলে বিভিন্ন দিক থেকে আমার সুবিধা হবে’। রেহানা জানান, শেষ পর্যন্ত মিসেস গান্ধিই তাঁর জন্যে লন্ডনের একটি বিমান টিকেটের ব্যবস্থা করেন। লন্ডনে এসে তিনি উঠলেন তাঁর খোকা চাচার বাসায়, এমনটাই জানান রেহানা। তিনি বলেন, ‘লন্ডনে এসে গাফ্ফার চাচা, এম আর আখতার মুকুলসহ ২/১ জন মানুষের সাথেই মাত্র যোগাযোগ হয়। হন্যে হয়ে খুজতে থাকি চাকুরী। ১৫ই আগষ্টের হত্যাকান্ডের বিচারের পক্ষে জনমত গড়ে তোলার পরিকল্পনাও করতে থাকি। সবকিছুর চেয়ে বেশি প্রয়োজন হয় একটি চাকুরীর। এসময় টের পাই দায় দায়িত্ব এমন ভাবে এসে ভর করেছে আমার উপর, যা রাতারাতি আমাকে বড় করে তুলেছে। নিজেই নিজের অভিভাবক। লন্ডনে থাকার জায়গা নেই, আশ্রয় নেই, চাকুরীর জন্যে হন্যে হয়ে ঘুরছি, খোঁজ নেয়ার কেউ নেই আমার। আপাকে চিঠি লিখে মাঝে মাঝে পরামর্শ নেই’।

*মাথার উপর ছায়ার আশায় বিয়েতে মত

রেহানা বলেন, ‘এমনি পর্যায়ে যখন অনুভব করছিলাম আমার মাথার উপরে একটি ছায়া দরকার, ঠিক তখনই বিয়ের আলাপ আসে’। ড: শফিক সিদ্দিক তখন পড়াশোনার জন্যে লন্ডনে। রেহানা বলেন, ‘এই প্রস্তাব অবশ্য আব্বা বেঁচে থাকতেই নিয়ে এসেছিলেন প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জনাব জিল্লুর রহমান। কিন্তু তখন বড় ভাইদের বিয়ে হওয়ার পর আমার বিষয়ে আব্বা গুরুত্ব দেন নাই। বলেছেন পড়া লেখা শেষ হোক এরপর দেখা যাবে’। শেখ রেহানা জানান, একই প্রস্তাব যখন আবার আসলো তখন বোন শেখ হাসিনা তাঁর মতামতের উপরই ছেড়ে দিয়েছিলেন বিষয়টি। কিন্তু নিজের মাথার উপরে একটি ছায়ার আশায় বিয়ের প্রস্তাবটিতে সম্মতি দেন তিনি, এমনটাই জানালেন রেহানা। ৭৭ সালে তাদের বিয়ে হয়।

*আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আইনজীবিকে খুজতে থাকি

রেহানার মাথায় তখন আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলায় বঙ্গবন্ধুর ব্রিটিশ আইনজীবি স্যার থমাস উইলিয়ামের সাথে যোগাযোগের চিন্তা কাজ করছিল বলে জানান তিনি। উইলিয়ামকে দিয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার একটি আন্তর্জাতিক তদন্ত কমিটি করার মনোবাসনা তখন তাঁর মনে। রেহানা বলেন, ‘লন্ডনে এসে বঙ্গবন্ধু হত্যা তদন্ত কমিটি গঠনের চেষ্টা করতে লাগলাম। নোবেল বিজয়ী শন ম্যাবক্রব্রাইট, সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর মতিন চৌধুরী, গাফ্ফার চাচা, ড: কামাল হোসেনসহ অনেকের সাথে যোগাযোগ হলো। অনেক চেষ্টার পর সাক্ষাত পেলাম স্যার থমাস উইলিয়ামের। উনি তখন রানীর কুইন্স কাউন্সিলার হয়ে লর্ডস সভার সদস্য। আমি উনাকে চিনতাম। আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলা চলাকালীন উনি যখন ঢাকায় গিয়েছিলেন আমি তখন তাঁকে চা নাস্তা করে খাইয়েছি। মার সাথে কথা বলার সময় পাশে বসে থাকতাম। থমাস উইলিয়ামও আমাকে দেখে চিনে ফেললেন। তিনি আমার মাথায় হাত দিয়ে বললেন, ‘‘ দুর থেকে তোমাকে দেখে মনে হয়েছে বেগম মুজিব হেটে আসছেন’’। আমার সাথে তখন ড: সেলিমও ছিলেন। সৈয়দ আশরাফ ভাই যেতে পারেননি কি কারনে জানি। থমাস উইলিয়াম আমাদের সব ধরনের সাহায্য করতে রাজি হলেন। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সব ধরনের সাহায্য করবো, কিন্তু নিজে কিছুতে থাকতে পারবো না। কারন আমি এখন কুইন্স কাউন্সিলার। তিনি আইনজীবিও ঠিক করে দেবেন বলে প্রতিশ্রুতি দেন’। রেহানা জানান, এরপর ৭৯ সালে তিনি সুইডেন যান। সেখানেই প্রথম শেখ হাসিনার নাম দিয়ে ব্যানার টাঙ্গিয়ে প্রথম প্রকাশ্য প্রতিবাদ কর্মসূচী পালন করেন। তিনি বলেন, ‘আমার তখন পাসপোর্ট নেই। আমার পাসপোর্ট এর আগেই কেড়ে নিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। ব্রিটিশ সরকারের দেয়া একটি ট্রেভেলস ডকুমেন্টস নিয়ে যাই সুইডেন। এরপর আস্তে আস্তে সব এগুতে থাকে। আমরা ইন্টারন্যাশন্যাল মার্ডার এনকুয়ারী কমিটি করলাম। এখানে দুইজন আইনজীবি ঠিক করে দিলেন থমাস উইলিয়াম। এভরি রোজ নামের একজন সলিসিটরও ঠিক করে দিলেন তিনি। থমাস উইলিয়ামের একজন ছেলেও আইনজীবি হিসেবে সম্পৃক্ত হলেন কমিটিতে। আইনজীবিদের ঢাকা যাওয়ার টিকেটের পয়সা সংগ্রহ করা হলো প্রবাসী ভাইবোনদের কাছ থেকে। সাধ্যানুযায়ী সবাই দান করলেন এই তহবিলে। ঢাকায় রাজ্জাক ভাইরাও আনুসঙ্গিক সব কিছু ঠিক করে রাখলেন’।

*ভিসা না দিতে হাইকমিশন বন্ধ করে দেয়া হয়

রেহানা জানালেন, কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর ঢাকা যাওয়া হয়নি এই টিমের। আইনজীবিরা যেদিন ভিসার জন্যে হাইকমিশনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন সেদিন পুরো হাইকমিশনই বন্ধ করে রাখা হয়, ভিসা দেয়াতো দুরের কথা। তিনি বলেন, ‘এটি হলো ৭৯ বা ৮০ সালের কথা’। তিনি জানান এরপরও হতাশ না হয়ে বঙ্গবন্ধু হত্যার তদন্ত ও বিচারের দাবিতে তৎপরতা চালাতে থাকেন। তিনি বলেন, ‘সুইডেন থেকে ফিরে আসার পর লন্ডনে আমার সাক্ষাত হলো মালেক উকিল, সামাদ আজাদ ও ড: কামাল হোসেন সাহেবের সাথে। তাদের সাথে নিয়ে আমি ওয়েষ্ট মিনিষ্টারের কাছে একটি রেষ্টুরেন্টে প্রেস কনফারেন্স করলাম, আওয়ামী লীগ নেতা আতা খান সাহেবের রেষ্টুরেন্টে। ঐ প্রেস কনফারেন্সে আমি একটি লিখিত বক্তব্য রাখলাম। সাংবাদিকদের সব প্রশ্নের জবাব দিলেন ড: কামাল হোসেন’। রেহানা জানান, এরপর ৮০ সালের দিকে শেখ হাসিনা যখন লন্ডন আসেন তখন পার্টি নেতাকর্মীসহ অনেকের সাথেই যোগাযোগ হয় তাদের। বিয়ের পর ৭৭ সালের শেষের দিকে লন্ডনে তাঁর প্রথম খোঁজ পান আওয়ামী লীগ নেতা গৌস খান, খালেদা দবির ও তৎকালীন ন্যাপ নেতা নিখিলেশ চক্রবর্তী, এমনটাই জানালেন শেখ রেহানা।

*বিচার দাবির ক্যাম্পেইন নিয়ে কত বিদ্রুপ

রেহানা বলেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার দাবি করে আমরা ক্যাম্পেইন শুরু করলাম। এই ক্যাম্পেইন নিয়েও কতজন যে কত বিদ্রুপ করলো। লন্ডনে আসার পর চাকুরীর জন্যে যখন রাস্তায় রাস্তায় ঘুরি, তখন কত পরিচিতজনদের সাথে সাক্ষাত হয়, সবাই এড়িয়ে যেতে চায়। চাকুরী নিলাম একটি লাইব্রেরী ও পাবলিশার্স কোম্পানীতে। এরপর তো অনেক পথ পাড়ি দিলাম’।

*চেনা লোকজন চোখ ফিরিয়ে নিলো

রেহানা আরও বলেন, ‘আমাদের বাসায় রাত দিন আসা যাওয়া এমন ব্যক্তিও রাস্তায় দেখা হলে চোখ ফিরিয়ে নিত। অবশ্য কেউ কেউ সাহায্যও করেছেন। এরমধ্যে একজন শিপিং কর্পোরেশনের এক বড় অফিসার, এ জেড আহমেদ আমাকে খুবই সাহায্য করেছেন। আব্বার প্রিন্সিপাল সেক্রেটারী রুহুল কুদ্দুস ও মঈনুল ইসলাম সাহেবও আমার খোঁজ খবর নিয়েছেন নিয়মিত। রুহুল কুদ্দুস ও তাঁর স্ত্রী আমার বিয়ের সময় খাবার রান্না করেন। আর বিয়ের উকিল ছিলেন মঈনুল ইসলাম সাহেব। উনারা আমার মুরুব্বী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তখন। আরেকজন ভদ্রলোক ড: শহীদুল্লার নাতি মনসুরুল হক, তাঁকে আমরা হীরু মামা বলে ডাকি, তিনিও আমার জন্যে অনেক করেছেন। উনি এখনও বেঁচে আছেন, আমার সাথে এখনও যোগাযোগ আছে। এই হীরু মামার সাথে পথ চলতে আমার পরিচয়। হীরু মামা ও আহমেদ আঙ্কেল এই দুইজন আমার জন্যে অনেক করেছেন। আসলে এতিমের জন্যে আল্লাহই কাউ না কাউকে পাঠিয়ে দেন, এদুজন আমার জন্যে সেরখমই ছিলেন’। রেহানা বলেন ‘ঘটনা তো অনেক। এগুলো বলে শেষ করা যাবে না’।

Facebook Comments

এ জাতীয় আরো খবর

%d bloggers like this: