স্মৃতিতে ওসমানী নগর —

0
64


ওসমানী নগর ,একটি নাম একটি ইতিহাস। মূক্তিযূদ্ধের সর্বাধিনায়ক বঙ্গ বীর জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গনি ওসমানীর স্মৃতি বিজড়িত দয়ামীর তার পিতৃ-পুরূষের বসতবাড়ী।কমল গঞ্জের মতই ওসমানী নগর নামে কোন শহর বন্দর কিম্বা হাট বাজার নেই! উপজেলার নাম ওসমানী নগর।কমল গঞ্জেও তাই।কমল গঞ্জ নামে কোন হাট বাজার শহর বন্দর নেই। সিলেটে আসলে যে কেউ যেমন হযরত শাহজালালের মাজার জিয়ারত করেন,ওসমানী নগরেও কেউ আসলে প্রথমেই ওসমানী সাহেবের পিতৃ পুরুষের ভীটে মাটি জিয়ারত (ভিজিট) করেন।আমার বেলায়ও তার ব্যাতিক্রম ঘটেনি।বাড়ীটি মহামান্য সরকার বাহাদুর সংরক্ষণ করেন নি! এমনকি প্রধান ফটকে কোন সাইন বোর্ডও নেই।তিনি কোন চাটার দল রেখে যাননি যে চেটে চেটে খাবে আর গুণ কীর্তন করবে।মূক্তিযোদ্ধের সর্বাধিনায়ক হিসেবে যার রণকৌশলে মাত্র নয় মাসে হানাদার বাহিনী কপোকাত তার নামে সেই দেশের রাজধানীতেও কোন সড়ক মহা সড়ক কম্বা এভ্যিনিউ চোখে পড়েনি যদিও তার অধিনস্থ সেকটর কমান্ডারদের নামে আছে ।তাও কম কি!
ওসমানী নগর এলাকায় আমার মরহুম আম্মাজান তার জীবনের শেষ ক’টি মাস অতিবাহিত করেন এবং এখানেই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।তাই ওসমানী নগরের মাটি ও মানুষের সাথে আমার নাড়ীর সম্পর্ক,হৃদ্বতা গড়ে উঠেছে এখানকার সর্বস্থরের মানুষের সাথে।তাদের আতীথেয়তায় আমি বিমূগ্ধ। বর্তমান চেয়ারম্যান জনাব ফখ্রুদ্দীন,প্রাক্তন চেয়ারম্যান জনাব মহররম আলী,মোশাহীদ আলি,দয়ামীর মাদ্রাসার প্রিন্সিপাল হযরত মাওলানা মশাহীদ দয়ামীরি(খাল পারি হুজুর),মদীনা জামে মসজিদের মোহতামীম জনাব মোশাহীদ আলি, প্রকৃত(ভূয়ায় দেশ সয়লাব)  বীর মূক্তিযোদ্ধা জনাব ছনাওয়ার আলী মাস্টার, ইক্বরাহ স্কুলের প্রিন্সিপাল,আল-এহসান ওয়েলফেয়ার সোসাইটির চেয়ারম্যান মাওলানা মোখতার হোসেন ও কর্ম কর্তা বৃন্দ সহ বিভিন্ন স্তরের মানুষের সাথে মেশার সৌভাগ্য আমার হয়েছে।
এক সন্ধ্যায় জনাব ছনাওর আলী মাস্টার সাহেব তার মূক্তি যূদ্ধের স্মৃতি বর্ণা করতে গিয়ে বলেন ” আওগরতলা থেকে ২০০ জন শিক্ষিত যূবককে সামরিক বিমানে দেরাদূন নিয়ে যাওয়া হয়।সেই ক্যাম্পের দ্বায়িত্বে ছিলেন বর্তমান তথ্য মন্ত্রী হাসানুল হক ইনু।সেখানে তার শেখ জামাল,সিরাজুল আলম খান,নূরুল হুসেন চঞ্চল,আখতার ভাইসহ যুব নেতৃবৃন্দের সাথে দেখা হয়।প্রশিক্ষণের এক পর্যায়ে ভারতীয় সেনা বাহিনীর এক জেনারেল বলেন( নাম আমি ভূলে গেছি) “জরুর আজাদী মিল জায়গী”।কারণ হিসেবে তিনি   ওসমানীর রেফারেন্স দিয়ে বলেন “শের কো ছুড় দিয়া আওর বিল্লি কো পাকাড়লিয়া”। উনি ওসমানিকে বাঘের বাচ্চা হিসেবে বর্ণাণা করে বলেন আজাদী জরুর মিল জায়গী।খান বাহাদুর মফিজুর রহমান (আইসিএস)-এর সুযোগ্য সন্তান জেনারেল মোহাম্মদ আতাউল গণি ওসমানী এম,এ,আলিগড় (আইসিএস) ছিলেন প্রকৃতই বাঘের বাচ্চা।ততকালীন বৃটিশ রাজকীয় বাহিনীর বাহিনীর সর্ব কণিস্ট মেজর। বার্টিশ বাহিনীতে তিন বছরে তিনটি পদোন্নতি হলেও পাক আমলে সারা জীবনে মাত্র একটি প্রমোশন নিয়ে তাকে অবসরে যেতে হয়।
পীর কণাই শাহর স্মৃতি বিজড়িত এই অঞ্চল। কণাই শাহ সম্পর্কে নানা প্রবাদ প্রচলিত আছে।এই প্রসংগে জনাব ছনাওয়র আলী সাহেব বলেন “একদা চার ব্যক্তি ভাটি অঞ্চল থেকে এসে কনাই শাহর বিরুদ্ধে অভিযগ দিতে থাকেন শালিশ বিচারকদের কাছে।এদের একজন নাকি বিদেশে যাবেন জমি বন্ধক রেখে টাকা সংগ্রহ করে বরকত বাড়ানোর জন্য কনাই শাহর কাছে দেন কিন্তু কণাই শাহ সেই টাকা নিয়ে উধাও।কণাই শাহকে জিজ্ঞাসা করলে দেখা গেল তিনি ইতিমধ্যেই এই টাকা নানা জনকে দান করে ফেলেছেন।সুতরাং নিরুপায় হয়ে তারা চলে গেলেন।কণাই শাহ কেবল বলে “উকুম দিছি কাম অইব” উকুম মানে হুকুম।বেশ কিছু কাল পর এই চার জনের তিন জন আবার এই এলাকায় এসে কণাই শাহর খোজ নেন।তারা কণাই শাহর জন্য আরোও পাচ হাজার টাকা নিয়ে এসেছেন!! তারা ঘটনার যে বর্ণা দেন তা মোটামোটি নিম্ন রুপঃ- যার কাছে জমি বন্ধক দিয়ে বিদেশে যাওয়ার কথা ছিল তিনি বন্ধকী সম্পত্তি ফেরত নিতে চাপ দেন।কিন্তু কিভাবে নেবে টাকাতো কণাই শাহ নিয়ে গেছে।বল্লেন টাকা লাগবেনা রেজিস্ট্রী অফিসে আস।কিন্তু রাজিস্ট্রীর টাকাও নেই। বললেন সমস্যা নেই আমি দেব। কারণ জিজ্ঞাসা  করলে বলেন গত কয় রাত তিনি বিনিদ্র আছেন,চোখ বুঝলেই এক পাগল এসে গলা চেপে ধরে বলে তাড়াতাড়ি ফেরত দে-।এর ও কিছু কাল পর এক বিধবা এসে হাজির উনার লন্ডনী স্বামী মারা গেছেন।কফিনের ভিতরে তার পাসপোর্ট ও এসেছে।গলা কেটে ছবি বসিয়ে কাউকে পাঠানো যাবে কিন্তু উপায় নেই ।ঘুমের মধ্যে এক পাগল এসে চেপে ধরে বলে অমূককে দিয়ে দে-।মহিলা বলেন এই নাও পাসপোর্ট।কিন্তু ভাড়ার টাকা তো নেই।মহিলা সাথে সাথে ভাড়ার টাকা দিয়ে বলে যাও আমাকে বাচাও। লন্ডনে গিয়ে উনি কণাই শাহর জন্য আরো পাচ হাজার টাকা পাঠিয়ে দেন!
কণাই শাহ সম্পর্কে আরেকটি ঘটনা বীর মূক্তিযোদ্ধা ছনাওর আলী সাহেব এভাবে বর্ণা করেনঃ-যৌবনে কণাই শাহ এক সুন্দরী রমণীকে বিবাহ করেন যিনি ছিলেন ছনাওর আলী সাহেবের মামির বান্ধবী(আমার স্মৃতি যদি আমাকে বিভ্রান্ত না করে)। কণাই শাহর চাউল-চুলা ঠিক না থাকায় তার শ্বশূড় ভাড়ি লোক জন বউকে আটকিয়ে রাখেন,এলাকার কোন মুরব্বী নিয়ে আসতে বলেন।কিন্তু মুরব্বী কেবলই তারিখের পর তারিখ দেন আর কণাই শাহ সকাল বিকাল ঘুরতে থাকেন।অবশেষে মাতব্বর বলেন ঃকণাই তুমি একজন মহিলার জন্য যেভাবে আশিক হয়েছ যদি আল্লাহর জন্য হতে তাহলে কামিয়াব হয়ে যেতেঃ একথা শুণার পর কণাই শাহ আর ঐ বাড়ীর উঠান মাড়াননি কখনও। চুল-দাড়ী লম্বা হতে থাকে।কোন এক কবর স্থানে পড়ে থাকেন। মাঝে মাঝে ক্ষুধা পেলে বাড়ী এসে বলেন- মা ভাত দে-। এক দিন ভাত চাইলে মা বলেন ঃতুই মরছনা কেনে,আমার গাভীন ছাগীটা মরি গেল তুই মরলে এত কস্ট পাইলামনানে”।একথা শুনে কণাই শাহ বাড়ি থেকে বেরিয়ে মরা ছাগলের কাছে গিয়ে বলে “এই ছাগী উঠ, তোর দাম নাকি আমার থাকি বেশী” একথা বলে তিনি পর পর তিনটি লাথি মারের।তৃতীয় লাথীতে মরা ছাগল উঠে দৌড়দেয় এবং বাড়ী গিয়ে যথা রীতি বাচ্চা প্রসব করে।
এই বীর মূক্তিযদ্ধার সাথে আরো অনেক কথা হয় যা ‘ এই স্বল্প পরিসরে বর্ণণা সম্ভব নয়।
তিনি বলেন কনাই শাহর মাজারের অর্থ দিয়ে স্থানীয় ওসমানী মিলনায়তের আংশিক জায়গা ক্রয় করা হয়।এবং স্থানীয় স্কুল বিল্ডিং এর কাজ করানো হয়।
দয়ামীর মদীনা জামে মসজিদ “একটি মাস্টার পীস অব ইসলামিক আর্কিটেকচার” প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যায়ে আল্লাহর ঘরটি অত্যন্ত দৃস্টি নন্দন।কমিটির সভাপতি হযরত মাওলানা মশাহীদ দয়ামীরি সাহেব ও মোতাওয়াল্লী জনাব মশাহীদ সাহেব সহ মসজিদ কমিটির কর্মকর্তাদের মোবারকবাদ।উদ্ভোধনীতে অনুস্টানে উপস্থিত ছিলেন এলাকার সাংসদ (একেবারেই যুবক) জনাব ইয়াহীয়া চৌধুরী বালাগঞ্জ উপজেলা চেয়ারম্যান,ওসমানী নগর উপজেলা চেয়ারম্যান,বিশ্বনাথী হুজুর সহ সকল ইউপি চেয়ারম্যান ,সর্বস্থরের জনগন, আলেম ওলাম্‌ ছাত্র শিক্ষক সহ নানা মত ও পথের প্রায় দেড় সহস্রাধিক মানুষ! সকলের দুপুরের খাবার সরবরাহ করেন ঐতিজ্যবাহী সোনার বাংলা রেস্তোরা। এই মহতি অনুস্টান ওসমানী নগরবাসীর মিলন মেলায় পরিণত হয়েছিল।আমার মত না-লায়েক অতি তুচ্ছ নগন্য বান্দাকে এই মহতি অনুস্টানে কথা বলার সুযোগ দেয়ায় আমি নিজেকে সৌভাগ্যবান মনে করি। সব মিলিয়ে ওসমানী নগর আমার স্মৃতিতে আম্লান হয়ে থাকবে।
লেখক:বশীর উদ্দীন আহমেদ
আটলান্টা জর্জিয়া।

মন্তব্য

মন্তব্য