যারা জঙ্গিবাদে জড়িত তাদের কোনো ধর্ম নেই : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

পৃথিবীর সবচেয়ে মানবিক ও উদার ধর্ম হলো ইসলাম। কিন্তু সবচেয়ে দুঃখ লাগে তখন,  যখন সামান্য কিছু লোক এই ধর্মকে ব্যবহার করে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড চালায়।
দেশ থেকে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ উচ্ছেদে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তাঁর দৃঢ় অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করে দেশ থেকে এই দুই অশুভ শক্তিকে উচ্ছেদে আলেম-উলামাদেরকে আরো সোচ্চার হবার আহবান জানিয়েছেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এটা আমাদের জন্য সুখবর। দেশের মানুষের মধ্যে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদ বিরোধী একাট চেতনা সৃষ্টি হয়েছে। এই চেতনাটাকে আরও শাণিত করা দরকার। আপনারা যারা ধর্ম শিক্ষা দেন এটা মানুষকে আরো ভালো ভাবে বোঝাতে হবে এবং ওলামায়ে কেরামগণ এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারেন।.. আর কেউ যেন এই ভুল পথে না যায়।’

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আজ সকালে রাজধানীর ফার্মগেটস্থ বাংলাদেশ কৃষিবিদ ইনস্টিটিউট মিলনায়তনে বাংলাদেশ জমিয়তুল উলামা আয়োজিত সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদ প্রতিরোধে উলামা সম্মেলনে প্রধান অতিথির ভাষণে একথা বলেন।

ধর্মমন্ত্রী অধ্যক্ষ মতিউর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল। শোলাকিয়া ঈদ জামাতের গ্রান্ড ইমাম ও জমিয়তুল উলামার সভাপতি আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করেন।

অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা, মন্ত্রী পরিষদ সদস্যবৃন্দ, সংসদ সদস্যবৃন্দ, সরকারের উচ্চ পর্যায়ের কমৃকর্তাবৃন্দ, আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর প্রধানগণ, রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনের প্রধান স্বামী ধ্রুবেশানন্দ মহারাজ, খ্রীস্টান ধর্মীয় প্রধান আর্চবিশপ প্যাট্রিক ডি রোজারিও, বৌদ্ধ কৃষ্টি প্রচার সংঘের সভাপতি শুদ্ধানন্দ মহাথেরোসহ বিভিন্ন ধর্মের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গ, বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিকবৃন্দ এবং আলেম-উলামা সমাজের প্রতিনিধিবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানে ইসলামের দৃষ্টিতে সন্ত্রাস-জঙ্গিবাদ ও আমাদের করণীয় বিষয়ে দেশের এক লাখ আলেম উলামা স্বাক্ষরিত ‘ফতওয়া’র প্রেক্ষাপট তুলে ধরা হয়।

আল্লামা ফরিদ উদ্দীন মাসউদ অনুষ্ঠানে এই এক লাখ আলেমের স্বাক্ষর সম্বলিত ৩০ খন্ড ‘ফতওয়ার’ একটি খন্ড প্রতীকি হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হাতে তুলে দেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ইসলামের সঠিক শিক্ষাটা যেন সকলে পায় সে ব্যবস্থাটা আলেম-উলামাগণকে নিতে হবে। সে কারণে আমি মনে করি- আমাদের দেশব্যাপী যে জনমত সৃষ্টি হয়েছে। এটা আমাদের জন্য সুখবর। দেশের মানুষের মধ্যে জঙ্গিবাদ সন্ত্রাসবাদ বিরোধী একাট চেতনা সৃষ্টি হয়েছে। এই চেতনাটাকে আরও শাণিত করা দরকার।

আপনারা যারা ধর্ম শিক্ষা দেন এটা মানুষকে আরো ভালো ভাবে বোঝাতে হবে এবং ওলামায়ে কেরামগণ এখানে বিশেষ ভূমিকা রাখতে পরেন।’

শেখ হাসিনা বলেন, ‘ইতোমধ্যে আমরা যে নির্দেশ দিয়েছি সারাদেশে সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের বিরুদ্ধে একটা কমিটি করে জনমত সৃষ্টি করা সেখানে মসজিদের ইমামগণ রয়েছেন, ওলামায়ে কেরামগণ রয়েছেন সকল্ েমিলেই এটার ব্যাপক প্রচার চালাবেন।’

তিনি স্বাক্ষর সংগ্রহকে মহৎ একটি উদ্যোগ উল্লেখ করে বলেন, নিশ্চই এই এক লাখ আলেম কখনও মিথ্যা কথা বলবেন না। তারা সত্য কথা বলেন। কোরআনের কথা বলেন। সন্ত্রাসের পথ ইসলামের পথ নয়, এটি সাধারণ মানুষকে বোঝানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী তাঁদের দায়িত্ব দেন।

প্রধানমন্ত্রী ইসলামের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট স্মরণ করে বলেন, ইসলাম শান্তির ধর্ম, মানবতার ধর্ম, শান্তির বাণী ইসলামই প্রথম ছড়িয়েছে-এটাকে আমরা মানুষের কাছে নিয়ে যাব। কারণ ইসলামের যে শৌর্য-বীর্য ছিল- পুরনো ইতিহাস খুললে দেখা যাবে- মানুষের জীবনমান উন্নত করার সব শিক্ষা কিন্তু আমরা সেখান থেকে পেয়েছি।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আজকে সমান্য কয়েকটা লোকের জন্য আমাদের এই পবিত্র শান্তির ধর্ম হেয় প্রতিপন্ন হবে সেটা কাম্য নয়। অবশ্যই এটা কোরআনের বানী, আমাদের নবী করিম (সা.) এর বাণী এবং হাদিসে যা আছে তার ভিত্তিতেই আমরা ইসলামের সমৃদ্ধ মূল বাণীটা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে চাই। যাতে করে আর কেউ বিভ্রান্ত না হয়। আমাদের ধর্মকে আর যেন কেউ হেয় প্রতিপন্ন করতে না পারে, বদনাম করতে না পারে।

তিনি বলেন, এগুলো যারা করছে তারাতো আমাদের ধর্মটাকে একবারে হেয় করে দিচ্ছে। এটা সবথেকে কষ্টের, দুঃখের। তারা কি বুঝে করছে আমি জানিনা। তারা কোন বেহেশত পাবে জানিনা। তবে, মানুষ খুন করা যে কত বড় অপরাধ সেটা জানি- উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশের শতকরা ৯০ ভাগ মানুষ ইসলাম ধর্মাবলম্বী। তবে, বাংলাদেশের সব থেকে ভাল একটি দিক হচ্ছে- প্রত্যেক ধর্মের মানুষ প্রত্যেক ধর্মের মানুষকে শ্রদ্ধা করে এবং তাদের যে কোন বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করে। এটিই বাংলাদেশের সব থেকে বড় অর্জন।

এ প্রসঙ্গে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এবারও ঈদের জামাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর সঙ্গে হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা পাহাড়া দিয়েছে। তেমনি তাদের পূজা-পার্বণেও মুসলমান ভায়েরা, পাড়া-প্রতিবেশিরা তারাই তাদের রক্ষা করে, পাহাড়া দেয়। এভাবেই হিন্দু-খ্রীষ্টান-বৌদ্ধ-মুসলমানেরা সবার উৎসবে সবাই শরিক হন, সবাই সবাইকে সহযোগিতা করেন।

তিনি বলেন, ‘বাংলাদেশে এই যে সুন্দর একট সামাজিক ব্যবস্থা- এটা কিন্তু ইসলাম ধর্মই আমাদেরকে শিক্ষা দিয়েছে।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যখনই কোন আন্তর্জাতিক ফোরামে গিয়ে শুনেছি ইসলামকে সন্ত্রাসের সঙ্গে এক করে ফেলা হচ্ছে- আমি সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রতিবাদ করেছি। কিন্তুু অত্যন্ত দুঃখের বিষয় আজকে কিছু লোক এমন ঘটনা ঘটিয়েছে, সে কথা বলার আর মুখ নেই।

পবিত্র কোরআনের একটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, কেউ কোনো ব্যক্তিকে হত্যা করলে সে যেন গোটা মানবজাতিকে হত্যা করলো। আর কেউ যদি কোনো ব্যক্তিকে রক্ষা করে সে যেন গোটা মানবজাতিকে রক্ষা করলো।

আরেকটি আয়াতের উদ্ধৃতি দিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষ হত্যাকারী ও দুর্যোগ সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না।

শেখ হাসিনা এ সময় সাম্প্রতিক জঙ্গি হামলার প্রসঙ্গ উল্লেখ করে বলেন, এই যে পরপর কিছু ঘটনা ঘটলো, বিশ্বের অনেক দেশে এরকম ঘটেছে। তবে বাংলাদেশে এ ধরনের ঘটনা ঘটতে পারে আমরা কল্পনার মধ্যেই আনতে পারি না।

আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারি বাহিনীর ভূয়শী প্রশংসা করে তিনি বলেন, তারা (হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলাকারিরা) রমজানের মধ্যে তারাবীর নামাজের ওয়াক্তে নামাজে না গিয়ে যে মানুষ খুন করতে গেল, খাবার খাচ্ছে এমন বিদেশি-নিরীহদের ওপর হামলা করে তাদের হত্যা করল, তারা কোন ইসলাম কায়েম করছে।

তিনি একজন মুসলামান হিসেবে ঈদের জামাতে যোগ না দিয়ে শোলাকিয়ায় ঈদের জামাতে হামলার তীব্র নিন্দা করে বলেন, শোলাকিয়ায় পর্যাপ্ত আইন-শৃংখলা রক্ষাকারি বাহিনী মোতায়েন ছিল উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সে কারণেই সন্ত্রাসীরা ঈদ জামাত পর্যন্ত যেতে না পেরে সন্ত্রাসিরা আধা কিলোমিটার দূরের চেকপোস্টেই বোমা ফাটিয়ে দেয়।

সম্মেলনে আলেম সমাজের দাবির প্রেক্ষিতে কওমী মাদ্রাসা সনদ দেয়ার উদ্যোগ বাস্তবায়নের সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী বলেন, সনদ দিতে হলে ন্যূনতম একটা কারিকুলাম দরকার। আমরা কওমী মাদ্রাসা কমিশন গঠন করে দিয়েছি। কিন্তু কওমী মাদ্রাসার পাঁচটি বোর্ড একমত হতে পারেনি।

সবাইকে একমত হওয়ার আহ্বান জানিয়ে শেখ হাসিনা বলেন, সবাই একমত হোন অথবা যারা আগ্রহী তারা একমত হোন, আমরা বাস্তবায়ন শুরু করে দেবো।
সৌদি বাদশাহ’র সহযোগিতায় সারাদেশে প্রতিটি জেলা-উপজেলায় ৫৬০টি মসজিদ ও ইসলামিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র, ইসলামী সংস্কৃতি চর্চার পাদপিঠ হিসেবে প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান প্রধানমন্ত্রী।

বক্তৃতার শুরুতেই প্রধানমন্ত্রী জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ, সম্ভ্রমহারা ২ লাখ মা-বোনসহ জাতীয় চার নেতা এবং পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট শহীদ হওয়া বঙ্গবন্ধু পরিবারের সদস্যদের শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আগস্টে বারবার আঘাত এসেছে। পঁচাত্তরের ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়েছে। কয়েকদিন আগে স্বামীর কর্মস্থলে চলে গিয়েছিলাম বলে আমরা দুই বোন প্রাণে রক্ষা পাই। ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলায় আইভি রহমানসহ আমাদের ২২ জন নেতাকর্মীকে হারিয়েছি। পরপর ১৩টি গ্রেনেড ছোড়া হয়েছিল আমার ওপরে। নেতাকর্মীরা মানব ঢাল রচনা করে। আল্লাহর ইশারা ছিল বলেই রক্ষা পেয়েছি। সরাসরি গুলি করা হয়েছে, তাও কয়েকবার। আমাদের কোটালিপাড়ায় ৭৬ কেজি ওজনের বোমা পুঁতে রাখা হয়েছিল। একজন সাধারণ চা দোকানী দেখেছিলেন বলে সে যাত্রায়ও বেঁচে যাই।

তাঁর অলৌকিকভাবে প্রাণে রক্ষা পাওয়ার ঘটনাগুলোতে আল্লাহর ইশারা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আল্লাহ সব সময় কিছু কাজ দিয়েই মানুষকে দুনিয়ায় পাঠান এবং সেই কাজ সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত তিনিই হেফাজত করেন। এই বিশ্বাস নিয়ে আমি নির্বিঘেœ সকল বাধা অতিক্রম করেই চলার চেষ্টা করি।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আমি এইটুকু চাই- এদেশকে আমরা সন্ত্রাসবাদ-জঙ্গিবাদ মুক্ত করতে চাই। আমাদের দেশে সব ধর্মের মানুষ বসবাস করে। যেভাবে আমরা একটি সৌহার্দ্যপূর্ণ অবস্থানে রয়েছি। সেভাবেই এখানে প্রত্যেক ধর্মের মানুষ শান্তিতে তাদের নিজ নিজ ধর্ম পালন করবেন। তিনি বলেন, সুরা কাফেরুন’-এ বলা আছে -‘লাকুম দিনুকুম ওয়ালিয়াদীন’- আমরা সেটাই বিশ্বাস করি। এই ধর্মের মর্যাদাকে কেউ যেন ক্ষুন্ন করতে না পারে।

দেশে আইএসের অস্তিত্ব নেই উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল বলেন, দেশের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্ত খুজেঁ বেড়াচ্ছি। কিন্তুু, কোথাও আইএস খুঁজে পাইনি।
সন্ত্রাস ও জঙ্গিবাদের নিন্দা জানিয়ে আল্লামা ফরিদউদ্দীন মাসউদ বলেন, ইসলামে অনর্থক গাছের পাতাও ছেঁড়া নিষেধ । যারা মনে করে মানুষ হত্যা করে বেহেশতে চলে যাবে, তারা আসলে জাহান্নামে যাবে। যারা মানুষ হত্যা করে, আত্মহত্যা করে তারা উভয়ই জাহান্নামে যাবে।

১৫ আগস্টের শহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে তিনি বলেন, ইতিহাসে কারবালার ঘটনার পর এতো নিষ্ঠুর ও হৃদয়বিদারক ঘটনা আর ঘটেছে বলে আমাদের জানা নেই।
অনুষ্ঠান শেষে মওলানা আল্লামা ফরিদউদ্দীন মাসউদ বাংলাদেশ, বঙ্গবন্ধু পরিবার এবং সমগ্র মুসলিম বিশ্বের শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে অনুষ্ঠিত বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন।

Facebook Comments

Leave a Reply