ভাঙ্গা নৌকায় “রোকন উদ্দিন” খোঁজে বন্ধুরে…

0
78


 ফকিরও বানাইলোরে সিলেট শহরে বাউলা বানাইলোরে সুরমা নদীরে – সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার এসএম রোকন উদ্দিনকে এভাবেই বদলে দিয়েছে সিলেট শহর। তার গানের লাইনের মতোই জীবন দর্শনও পাল্টে গেছে পুলিশের অন্যতম এই শীর্ষ কর্মকর্তার।

স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে কবিতা আর আধুনিক গানের চর্চা করলেও বতর্মানে সে ধারা বাদ দিয়ে মরমী ধারায় অবগাহন করেছেন। পাল্টে যাওয়া এ দর্শনের জন্য সিলেটের সৌন্দর্যকে মূল কারণ হিসেবে তিনি আখ্যায়িত করেন।

তিনি বলেন, রাধারমন, শীতালং, হাসনরাজা, আরকুম শাহ, আবদুল করিম যে সৌন্দর্য্যে নিজেদের বিলীন করে বাউল চর্চায় মেতেছিলেন, সে সৌন্দর্য তাকেও হাতছানি দিয়ে ডাকে। নিশিরাতে কিংবা চলার পথে ভেতর থেকে নিংড়ে আসে গানের কথা ও সুর। সেই সুর বাজে নিজের মন ও মননে। খুঁজে ফিরেন জীবনের মানে।

তিনি বলেন, ১৯৯৫ সালে পুলিশে যোগদানের পর দেশের প্রায় প্রতিটি জেলা ঘুরে বেড়িয়েছেন পেশাগত কাজে। বাংলার রূপ তাকে ভাবুক করে তোলে। ভারত ও মালয়েশিয়া ভ্রমনের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি স্বদেশ ভ্রমন তাকে মরমী জগতে টেনে আনে। অন্তর থেকে তাড়া আসে, মরমী গানের ভূবনে অবগাহনের। সেই ডাকে সাড়া দিয়ে ২০১৩ সালে সিলেট মেট্রোপলিটন পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে যোগদানের পর পাল্টে যায় তার চিন্তাধারা।

তার মতে, এদেশের সৌন্দর্যের তুলনা শুধুই এদেশ। এদেশে মাটি ও মানুষ মরমী সাধনার জন্য উপযুক্ত ভূমি।

তিনি বলেন, তার জন্ম খুলনা অঞ্চলে। ওই অঞ্চলে লালন শাহ ছিলেন জনপ্রিয়। লালনের গান মাটি ও মানুষের গান। লালনের জীবন দর্শন তাকে আকর্ষিত করে।

ব্যক্তি জীবনে ৩ সন্তানের জনক এসএম রোকন উদ্দিন। তার স্ত্রী গৃহিনী। এক ছেলে ও ২ মেয়ে তার। বড় মেয়ে সদ্য এসএসসি পাশ করে কলেজে ভর্তি হবে। বাকী দুজন এখনো স্কুলে পড়ালেখা করছে।

জীবন দর্শন নির্ভর গানের রচয়িতা এসএম রোকন উদ্দিন তার গানে স্রষ্টার তালাশ করেন।

তিনি বলেন, ‘দুই দিনের অতিথি আমি ভবের বাজারে, মনের দুঃখে চাইলাম যারে পাইলাম না তারে।’ আরেকটি গানে স্রষ্টার তালাশে তিনি লিখেছেন, ‘নাটাই তাহার কাহার হাতে…’। আবার অন্যখানে তিনি বলেছেন, ভাঙ্গা নৌকায় রোকন উদ্দিন খোঁজে বন্ধুরে। জীবনের চাওয়া পাওয়ার হিসেব মিলাতে গিয়ে বলেছেন, ‘মূলধন হারাইয়া আমি ভাসি যে সাগরে…’।

আরেক জায়গায় তিনি বলেছেন, দিনে দিনে সোনার তনু মলিন হইয়া যায়।

বাঁধনহারা মনের লাগাম টেনে ধরা হয়নি মরমী এ গীতিকারের। তার গানে এর প্রতিফলন দেখতে পাওয়া যায়।

তিনি এক স্থানে লিখেছেন, আমার পাগলা ঘোড়া মন, বাঁধন ছেড়া মন, কেমনে তোরে করি নিয়ন্ত্রণ। আবার তিনি লিখেছেন, সৎ সঙ্গ ছেড়ে, অসৎ সঙ্গ ধরে, উড়াইয়া নিলি আমায় সর্বনাশা ঝড়ে।

২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিল সিলেটে অতিরিক্ত কমিশনার হিসেবে যোগ দেন এসএম রোকন উদ্দিন। সংস্কৃতিমনা কর্মকর্তা হিসেবে তিনি যেমন জনপ্রিয় তেমনি কঠোর পুলিশ কর্মকর্তা হিসেবেও তিনি সমাদৃত। তার কার্যালয় সব সময় সবার জন্য খোলা উল্লেখ করে তিনি বলেন, কেউ কোনো সমস্যা নিয়ে আসলে আমি প্রথমেই সংশ্লিষ্ট থানার ওসিকে ফোন করি। পরে তদন্তকারী কর্মকর্তাকেও ফোনে বলে দিই যাতে কোনো ধরণের ‘ইনজাস্টিজ’না হয়। শুধু ফোন করেই দায়িত্ব শেষ করি না আমি। পরবর্তীতে এর ‘ফিডব্যাক’নেই।

তিনি বলেন, পেশাগত কারণে পুলিশের সাথে সাধারণ মানুষের দুরত্ব কমিয়ে আনাই আমার মূল লক্ষ্য। গণমূখী পুলিশিং সেবা চালু করতে নানা পদক্ষেপ নিয়েছি।

পুলিশের মতো একটি দায়িত্বশীল ও ঝুঁকিপূর্ণ কাজের সাথে মরমী সাধনার সমন্বয় করার ব্যাপারে এসএম রোকন উদ্দিন বলেন, মূলত রাতেই আমার সাধনা চলে। রাত ১টা থেকে ফজর পর্যন্ত আমি একটি ঘোরের মধ্যে থাকি। এ সময় আমি গান লিখি, তাহাজ্জুদের নামাজ পড়ি। আমার ঘুমানোর সময়টা হচ্ছে ফজরের পর। মরমী সাধনার ক্ষেত্রে পুলিশের কাজে কোনো প্রভাব ফেলতে পারে না। আমি শেষ রাতেই বেশিরভাগ লেখালেখি করে থাকি। আমার ভ্রমণের সময়ও আমার লেখালেখি হয়। এছাড়া আমার পড়ার ক্ষুধা প্রচণ্ড। আমি প্রতিনিয়ত পড়ার চেষ্টা করি। জানার আগ্রহ আমার বেশি। আমি শ্রেণি-পেশা নির্বিশেষে সকল মানুষকে ভালোবাসি। পুলিশের কাজই আমার মূল কাজ। মরমী গান লেখাটা মূলত অন্তর থেকে আসে। তাই আমার পেশার সাথে এটা সাংঘর্ষিক নয়।

তিনি বলেন, জীবনের বাস্তবতা নিয়ে এখনো লিখি আমি। জীবন দর্শন নিয়েও আমার লেখা রয়েছে।

অবসর জীবনের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি বলেন, অবসরে সমাজসেবা করে কাটিয়ে দিতে চাই। এছাড়া আমার লেখা সংগ্রহ করারও পরিকল্পনা রয়েছে।

মন্তব্য

মন্তব্য