আজঃ ২৯শে কার্তিক ১৪২৫ - ১৩ই নভেম্বর ২০১৮ - রাত ১১:০৬

ফুটবলার তানভীরের মেয়েদের দেখার যেন কেউ নেই

Published: অক্টো ১৪, ২০১৮ - ১১:৫৫ পূর্বাহ্ণ

ক্রীড়া ডেস্ক :: তাজবিতা ও তানবিতা খুঁজে ফেরে বাবাকে। কিন্তু বাবা আর ফিরবেন না। জীবনের তরে হারিয়ে গেছেন জাতীয় দলের ও আবাহনীর সাবেক তারকা মিডফিল্ডার তানভীর চৌধুরী। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ৪০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

একসময়ের দেশসেরা খেলোয়াড় তানভীরের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল দুঃসহ যন্ত্রণায়। ২০১৫ সালের ১৯ মে ঢাকা আসার পথে গুরুদাসপুরের কাছিকাটায় বিপরীতমুখী একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মক আহত হয়ে সাড়ে তিন বছর পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন। শোয়া থেকে উঠে বসতে পারতেন না। দু’কদম হাঁটতে পারতেন না।

ঘরে শুয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল মাঠের এই যোদ্ধাকে। কেউ তার খবর নেয়নি। সড়ক দুর্ঘটনার পরপরই গুরুতর অবস্থায় ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তানভীরকে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গিয়েছিলেন নাটোরের ফুটবলার। অবচেতন অবস্থায় প্রায় দেড় সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন তানভীর।

এরপর চরম আর্থিক সংকটে পরে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। খেলা ছাড়ার পর কোনো কর্মসংস্থান ছিল না তার। সতীর্থ ফুটবলার আরিফ খান জয় যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী হওয়ার পর কাজের সন্ধানে প্রায়ই ঢাকায় আসা-যাওয়া করতেন তানভীর। তার চিকিৎসার জন্য বেশ সহায়তা করেছিলেন জয়।

ওই সময়েও হাসপাতালে যাননি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কর্তারা। স্কয়ার হাসপাতালের বিছানায় অচেতন হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে যেদিন লড়ছিলেন তানভীর, সেদিন অ্যাওয়ার্ড নাইটের নামে গান-বাজনার আয়োজন করেছিল বাফুফে। লাখ লাখ টাকা অপচয় করে আনন্দ-উপলক্ষ তৈরি করেছিল বাফুফে।

তানভীর মারা যাওয়ার পর বাফুফের কর্মকর্তারা তার পরিবারকে সমবেদনা জানাতে নাটোর যাওয়া তো দূরের কথা, টেলিফোনও করেননি। অথচ মঙ্গলবার স্বদলবলে রোহিঙ্গাদের ফুটবল খেলানোর জন্য কক্সবাজারে যাচ্ছেন তারা। সঙ্গে নিয়ে যাবেন ফিফা ও এএফসির কর্মকর্তাদের। মানবতা দরদি হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছেন নিজেদের। কিন্তু তানভীরের দুই অবুঝ সন্তান আট বছর বয়সী তাজবিতা ও তিন বছর বয়সী তানবিতার মাথায় দরদমাখা হাত বুলানোর যেন কেউ নেই।

জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার হাসানুজ্জামান খান বাবলু বলেন, ‘যারা দেশের ফুটবল-উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, রাখছেন, তাদের বিপদে ঘুরেও তাকায় না এই সময়ের বাফুফে কর্তারা। ফুটবলের স্বার্থে যারা নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন, তাদের অবহেলা করেই যায় তারা। সহযোগিতা দূরে থাক, তানভীরকে সেসময় দেখতেও যাননি সালাউদ্দিনরা। এটা খুবই দুঃখজনক।’

কারও বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ নেই তানভীরের স্ত্রী মিলি আফরোজ আলোর। দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে স্বামীর স্মৃতিকাতর হয়ে অঝোরে কাঁদছেন তিনি। আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছেন স্বামীর পরকালের শান্তির জন্য। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘ফুটবলই ছিল তানভীরের সব কিছু। ফুটবলের জন্যই পরিবারের প্রতি তেমন নজর দিতে পারেননি। আর্থিক সংকটের মধ্যেই দিন কাটছিল আমাদের। তারপরও সুখ ছিল, শান্তি ছিল। কিন্তু ঘাতক ট্রাক আমাদের সুখ-শান্তি কেড়ে নিয়েছে। দু’বছর ধরে আমার স্বামীর সঙ্গী ছিল হুইল চেয়ার। তানবিতা বাবাকে দেখতে না পেরে বাবা বাবা করে ডাকছে। খুব কষ্ট হয় আমার। তানভীরের উন্নত চিকিৎসার দরকার ছিল। যেখানে আমাদের খাবারই জুটত না, সেখানে উন্নত চিকিৎসা ছিল বিলাসিতা। এক প্রকার বিনা চিকিৎসাতেই মারা গেল তানভীর।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিলি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো অনেক খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের পাশে মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমার দুই মেয়ে শিশুকে নিয়ে আমিও প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রয়েছি।’

আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক এবং বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘তানভীরের মতো ফুটবলার যুগে যুগে জন্মায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে সাধ্যমতো অকাল প্রয়াত এই ফুটবলারের পরিবারের পাশে থাকব। সেই সঙ্গে এ ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনব

Facebook Comments

ক্রীড়া ডেস্ক :: তাজবিতা ও তানবিতা খুঁজে ফেরে বাবাকে। কিন্তু বাবা আর ফিরবেন না। জীবনের তরে হারিয়ে গেছেন জাতীয় দলের ও আবাহনীর সাবেক তারকা মিডফিল্ডার তানভীর চৌধুরী। গত মঙ্গলবার বেলা সাড়ে ১১টায় নাটোর আধুনিক সদর হাসপাতালে ৪০ বছর বয়সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

একসময়ের দেশসেরা খেলোয়াড় তানভীরের জীবনের শেষ দিনগুলো কেটেছিল দুঃসহ যন্ত্রণায়। ২০১৫ সালের ১৯ মে ঢাকা আসার পথে গুরুদাসপুরের কাছিকাটায় বিপরীতমুখী একটি ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে মারাত্মক আহত হয়ে সাড়ে তিন বছর পঙ্গু হয়ে পড়েছিলেন। শোয়া থেকে উঠে বসতে পারতেন না। দু’কদম হাঁটতে পারতেন না।

ঘরে শুয়ে দিন কাটাতে হয়েছিল মাঠের এই যোদ্ধাকে। কেউ তার খবর নেয়নি। সড়ক দুর্ঘটনার পরপরই গুরুতর অবস্থায় ঢাকার স্কয়ার হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল তানভীরকে। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে চলে গিয়েছিলেন নাটোরের ফুটবলার। অবচেতন অবস্থায় প্রায় দেড় সপ্তাহ চিকিৎসাধীন ছিলেন তানভীর।

এরপর চরম আর্থিক সংকটে পরে উন্নত চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি ছিলেন। খেলা ছাড়ার পর কোনো কর্মসংস্থান ছিল না তার। সতীর্থ ফুটবলার আরিফ খান জয় যুব ও ক্রীড়া উপমন্ত্রী হওয়ার পর কাজের সন্ধানে প্রায়ই ঢাকায় আসা-যাওয়া করতেন তানভীর। তার চিকিৎসার জন্য বেশ সহায়তা করেছিলেন জয়।

ওই সময়েও হাসপাতালে যাননি বাংলাদেশ ফুটবল ফেডারেশনের (বাফুফে) কর্তারা। স্কয়ার হাসপাতালের বিছানায় অচেতন হয়ে মৃত্যুর সঙ্গে যেদিন লড়ছিলেন তানভীর, সেদিন অ্যাওয়ার্ড নাইটের নামে গান-বাজনার আয়োজন করেছিল বাফুফে। লাখ লাখ টাকা অপচয় করে আনন্দ-উপলক্ষ তৈরি করেছিল বাফুফে।

তানভীর মারা যাওয়ার পর বাফুফের কর্মকর্তারা তার পরিবারকে সমবেদনা জানাতে নাটোর যাওয়া তো দূরের কথা, টেলিফোনও করেননি। অথচ মঙ্গলবার স্বদলবলে রোহিঙ্গাদের ফুটবল খেলানোর জন্য কক্সবাজারে যাচ্ছেন তারা। সঙ্গে নিয়ে যাবেন ফিফা ও এএফসির কর্মকর্তাদের। মানবতা দরদি হিসেবে চিহ্নিত করতে চাচ্ছেন নিজেদের। কিন্তু তানভীরের দুই অবুঝ সন্তান আট বছর বয়সী তাজবিতা ও তিন বছর বয়সী তানবিতার মাথায় দরদমাখা হাত বুলানোর যেন কেউ নেই।

জাতীয় দলের সাবেক তারকা ফুটবলার হাসানুজ্জামান খান বাবলু বলেন, ‘যারা দেশের ফুটবল-উন্নয়নে ভূমিকা রেখেছেন, রাখছেন, তাদের বিপদে ঘুরেও তাকায় না এই সময়ের বাফুফে কর্তারা। ফুটবলের স্বার্থে যারা নিজেদের বিলিয়ে দিয়েছেন, তাদের অবহেলা করেই যায় তারা। সহযোগিতা দূরে থাক, তানভীরকে সেসময় দেখতেও যাননি সালাউদ্দিনরা। এটা খুবই দুঃখজনক।’

কারও বিরুদ্ধে কোনো ক্ষোভ নেই তানভীরের স্ত্রী মিলি আফরোজ আলোর। দুই অবুঝ সন্তানকে নিয়ে স্বামীর স্মৃতিকাতর হয়ে অঝোরে কাঁদছেন তিনি। আল্লাহর দরবারে প্রার্থনা করছেন স্বামীর পরকালের শান্তির জন্য। এই প্রতিবেদকের সঙ্গে আলাপকালে বলেন, ‘ফুটবলই ছিল তানভীরের সব কিছু। ফুটবলের জন্যই পরিবারের প্রতি তেমন নজর দিতে পারেননি। আর্থিক সংকটের মধ্যেই দিন কাটছিল আমাদের। তারপরও সুখ ছিল, শান্তি ছিল। কিন্তু ঘাতক ট্রাক আমাদের সুখ-শান্তি কেড়ে নিয়েছে। দু’বছর ধরে আমার স্বামীর সঙ্গী ছিল হুইল চেয়ার। তানবিতা বাবাকে দেখতে না পেরে বাবা বাবা করে ডাকছে। খুব কষ্ট হয় আমার। তানভীরের উন্নত চিকিৎসার দরকার ছিল। যেখানে আমাদের খাবারই জুটত না, সেখানে উন্নত চিকিৎসা ছিল বিলাসিতা। এক প্রকার বিনা চিকিৎসাতেই মারা গেল তানভীর।’

কান্নাজড়িত কণ্ঠে মিলি বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী তো অনেক খেলোয়াড় ও তাদের পরিবারের পাশে মমতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। আমার দুই মেয়ে শিশুকে নিয়ে আমিও প্রধানমন্ত্রীর দিকে তাকিয়ে রয়েছি।’

আওয়ামী লীগের যুব ও ক্রীড়া সম্পাদক এবং বিশিষ্ট ক্রীড়া সংগঠক হারুনুর রশিদ বলেন, ‘তানভীরের মতো ফুটবলার যুগে যুগে জন্মায় না। আমি ব্যক্তিগতভাবে সাধ্যমতো অকাল প্রয়াত এই ফুটবলারের পরিবারের পাশে থাকব। সেই সঙ্গে এ ব্যাপারটি প্রধানমন্ত্রীর নজরে আনব

Facebook Comments

এ জাতীয় আরো খবর