আজঃ ১লা কার্তিক ১৪২৫ - ১৬ই অক্টোবর ২০১৮ - রাত ১২:২৯

পদ্মা সেতুতে পারাপার কবে

Published: অক্টো ০৩, ২০১৮ - ১:১৮ অপরাহ্ণ

প্রতিদিন ডেস্ক :: প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু দিয়ে পারাপার করা যাবে না। সেতু তৈরির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের আগে সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে সব ঠিকাদারই চান, সময় কমপক্ষে আরও দুই বছর বাড়ানো হোক। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় আপাতত এক বছরের বেশি মেয়াদ বাড়াতে চাইছে না। এমনিতেই দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন এই প্রকল্পের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। এসব বিবেচনায় নিয়েই সরকার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন বিলম্বের কথা বলতে চাইছে না।

এমনিতেই পদ্মা সেতুর প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেছে বহুগুণ। ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তারপরও সময়ের মধ্যে হচ্ছে না সেতু নির্মাণের কাজ। এখন সময় বাড়লে সেতু নির্মাণের ব্যয়ও বেড়ে যাবে। কত বাড়বে, সেই হিসাব এখনো করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, প্রকল্প শেষ করতে সময় বেশি লাগলে এর ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি এর অর্থনৈতিক সুবিধাও কমে।

এসব বিবেচনায় সরকার প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ সময় মেনে নিলে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করার সময়সীমা দাঁড়াবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ঠিকাদার, এমনকি সেতু বিভাগের কর্মকর্তারাও মনে করছেন, এই সময়ের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হবে না।

মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ পাওয়া চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) সময়সীমা আরও দুই বছর বাড়ানোর পক্ষে। নদীশাসনের কাজ করছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। তারাও সময় বাড়াতে সরকারকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া, প্রকল্পের কাজ তদারকিতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন সেতু বিভাগকে ২০ মাস সময় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। এসব প্রস্তাব অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২০ সালে।

প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরকার নির্বাচনের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের সময়সীমা বৃদ্ধির ঘোষণা দিতে চাইছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই এক বছর সময় বাড়াচ্ছে। কেননা, গত আগস্ট পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে বাকি তিন মাসে বাকি ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ কাজ শেষ করার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না করলে ঠিকাদারের বিল দেওয়া যাবে না। এই জটিল পরিস্থিতির কারণে সময় বৃদ্ধি বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।

বিলম্বের কারণ
‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত পদ্মা সেতু নির্মাণের বিলম্বের কারণ হিসেবে সেতু বিভাগ চারটি কারণের কথা বলেছে। যেমন: নদীর তলদেশের গভীরে নরম মাটির স্তর থাকায় সেতুর পিলার স্থাপনে সমস্যা, ২২টি পিলারের নতুন নকশা প্রণয়ন, নদীশাসনকাজে বিলম্ব এবং নদীভাঙন ও প্রবল স্রোত।

মূল সেতু ও নদীশাসনই হচ্ছে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কাজ। প্রকল্পের অগ্রগতি–সংক্রান্ত নথি অনুসারে, আগস্ট পর্যন্ত মূল সেতুর কাজ হয়েছে ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড় অগ্রগতি ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এই গতিতে এগোলে বাকি কাজ শেষ করতে অন্তত দুই বছর লাগবে। নদীশাসনের কাজের অগ্রগতি ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতি মাসে গড় অগ্রগতি ১ শতাংশের কম। এই গতিতে এগোলে কাজ শেষ হতে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে।

সেতু বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত মূল সেতুর ৪১টি পিলারের মধ্যে ১৪ টির কাজ শেষ। পিলারের ওপর ৫টি স্টিলের কাঠামো (স্প্যান) ইতিমধ্যে বসেছে। এখন সেতুর সাড়ে ৭০০ মিটার দৃশ্যমান। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে আর কোনো স্প্যান বসার সম্ভাবনা নেই। কারণ, পাইলিংয়ের জটিলতার কারণে ৭৫০ মিটারের সঙ্গে সংযোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় পিলার বসানো যায়নি। সব মিলিয়ে এখন যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে ২০২১ সালের আগে কাজটি শেষ হবে না।

জানতে চাইলে প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মূল সেতুর কাজ এক বছর ও নদীশাসনের দুই বছর সময় বেশি লাগতে পারে। সময় বৃদ্ধির ফলে এর প্রভাব ও ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যত দেরিতে সেতু চালু হবে, তত এর ব্যবহারের ফলে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাবে না। আর জ্বালানি তেল, স্টিল, সিমেন্ট ও বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি পেলে ব্যয় বাড়তে পারে বলে তিনি জানান।

বক্তব্য জানার জন্য পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সময় নিয়ে আলোচনা
পদ্মা সেতুর কারিগরি ও সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আছে ‘প্যানেল অব এক্সপার্ট’। প্রকল্প এলাকায় গত রোববার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এই বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক হয়েছে। বছরে তিন-চারবার এই বৈঠক হয়ে থাকে। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, বাড়তি ২২টি পাইল বসানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পাইলের চারপাশে কংক্রিটের বেড়ার মতো দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রেল ও পরিবহন চলাচলের জন্য যে ডেক বা পথ বসানোর কথা, সেটির কিছু কারিগরি ত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং কবে নাগাদ শেষ হতে পারে, সেটা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বর্তমানে মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি প্রতি মাসে গড়ে ২ শতাংশের কম। অথচ শুরুতে আড়াই থেকে ৩ শতাংশ হারে অগ্রগতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ঠিকাদারেরা এর জন্য নকশায় জটিলতাকে দায়ী করেন। বৈঠকে ২০২০ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করার বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়।

ব্যয় কেন আরও বাড়বে
সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত আইনে বিশেষ কোনো অবস্থার সৃষ্টি না হলে দুবারের বেশি প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করা যায় না। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য এই আইন শিথিল করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নে ২০০৭ সালে একনেকে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এরপর দুই দফা ব্যয় সংশোধন করা হয়। যেমন: ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আর এখন জমি অধিগ্রহণের জন্য বাড়তি যুক্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে এখন পর্যন্ত মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মূল প্রকল্প প্রস্তাব থেকে ব্যয় বেড়েছে ২০ হাজার ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর আগস্ট পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সময় বৃদ্ধি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজও বাড়তে পারে—এমন ধারণা কর্মকর্তাদের। এ ক্ষেত্রে ব্যয়ও বাড়তে পারে। সময় বৃদ্ধির ফলে অবধারিত ব্যয় বৃদ্ধি পাবে নির্মাণ-উপকরণ ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে। ২০১৪ সালে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করার সময় ডলারের মূল্য ছিল ৭৮ টাকা। এখন তা ৮৪ টাকা হয়ে গেছে। উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি বাবদ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যেই ৪০০ কোটি টাকা ধরা আছে। এর বেশি হলে মোট ব্যয়ও বাড়বে। এ ছাড়া অন্যদিকে কাজ বৃদ্ধির জন্যও প্রকল্পে ৪০০ কোটি টাকা রাখা আছে। কিন্তু নদীশাসনের জন্য তোলা বালু ফেলার জায়গা কেনায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে গেছে। এই কাজে আরও জমির প্রয়োজন হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, এক বছর সময় বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তে অখুশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কারণ, এর মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। আর কাজ শেষ না হলে জরিমানা গুনতে হবে। তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বাস দিয়েছে, প্রয়োজনে আরও সময় বাড়ানো হবে। তবে একবারে নয়, সময়-সময়। তাতে খরচও অবশ্য বাড়বে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও বৃহৎ প্রকল্প বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে ব্যয় বাড়বেই। এ ছাড়া মেয়াদ বাড়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের সেতুটি ব্যবহার করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে অর্থনৈতিক যে প্রাপ্তি শুরুতে ধরা হয়েছিল, তা কমে যাবে।

Facebook Comments

প্রতিদিন ডেস্ক :: প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী আগামী ডিসেম্বরে পদ্মা সেতু দিয়ে পারাপার করা যাবে না। সেতু তৈরির মেয়াদ আরও এক বছর বাড়ানো হচ্ছে। তবে শেষ পর্যন্ত ২০২১ সালের আগে সম্পূর্ণ কাজ শেষ না হওয়ার সম্ভাবনাই বেশি বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

তবে সব ঠিকাদারই চান, সময় কমপক্ষে আরও দুই বছর বাড়ানো হোক। কিন্তু সরকার রাজনৈতিক বিবেচনায় আপাতত এক বছরের বেশি মেয়াদ বাড়াতে চাইছে না। এমনিতেই দুর্নীতির ষড়যন্ত্রের অভিযোগের কারণে বিশ্বব্যাংকসহ আন্তর্জাতিক অর্থায়নকারীদের সঙ্গে সরকারের টানাপোড়েন এই প্রকল্পের রাজনৈতিক গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। এসব বিবেচনায় নিয়েই সরকার একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে পদ্মা সেতু চালু করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। কিন্তু এখন বিলম্বের কথা বলতে চাইছে না।

এমনিতেই পদ্মা সেতুর প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে গেছে বহুগুণ। ১০ হাজার কোটি টাকার প্রকল্প হয়ে গেছে প্রায় ৩০ হাজার কোটি টাকা। তারপরও সময়ের মধ্যে হচ্ছে না সেতু নির্মাণের কাজ। এখন সময় বাড়লে সেতু নির্মাণের ব্যয়ও বেড়ে যাবে। কত বাড়বে, সেই হিসাব এখনো করা হয়নি। বিশেষজ্ঞরাও বলছেন, প্রকল্প শেষ করতে সময় বেশি লাগলে এর ব্যয় যেমন বাড়ে, তেমনি এর অর্থনৈতিক সুবিধাও কমে।

এসব বিবেচনায় সরকার প্রকল্পের মেয়াদ এক বছর বাড়ানোর জন্য পরিকল্পনা কমিশনে প্রস্তাব পাঠিয়েছে। এ সময় মেনে নিলে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করার সময়সীমা দাঁড়াবে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবে ঠিকাদার, এমনকি সেতু বিভাগের কর্মকর্তারাও মনে করছেন, এই সময়ের মধ্যে সেতুর কাজ শেষ হবে না।

মূল সেতু নির্মাণের জন্য কাজ পাওয়া চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান চায়না মেজর ব্রিজ ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি (এমবিইসি) সময়সীমা আরও দুই বছর বাড়ানোর পক্ষে। নদীশাসনের কাজ করছে চীনেরই আরেক প্রতিষ্ঠান সিনো হাইড্রো করপোরেশন। তারাও সময় বাড়াতে সরকারকে চিঠি দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ ছাড়া, প্রকল্পের কাজ তদারকিতে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান কোরিয়ান এক্সপ্রেসওয়ে করপোরেশন সেতু বিভাগকে ২০ মাস সময় বাড়ানোর পরামর্শ দিয়েছে। এসব প্রস্তাব অনুসারে প্রকল্পের কাজ শেষ হবে ২০২০ সালে।

প্রকল্প–সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হওয়ায় সরকার নির্বাচনের আগে আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকল্পের সময়সীমা বৃদ্ধির ঘোষণা দিতে চাইছিল না। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়েই এক বছর সময় বাড়াচ্ছে। কেননা, গত আগস্ট পর্যন্ত কাজের অগ্রগতি ৫৭ দশমিক ৫ শতাংশ। ফলে বাকি তিন মাসে বাকি ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ কাজ শেষ করার কোনো সুযোগই নেই। কিন্তু প্রকল্পের মেয়াদ বৃদ্ধি না করলে ঠিকাদারের বিল দেওয়া যাবে না। এই জটিল পরিস্থিতির কারণে সময় বৃদ্ধি বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে।

বিলম্বের কারণ
‘ফাস্ট ট্র্যাক’ বা অগ্রাধিকার প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত পদ্মা সেতু নির্মাণের বিলম্বের কারণ হিসেবে সেতু বিভাগ চারটি কারণের কথা বলেছে। যেমন: নদীর তলদেশের গভীরে নরম মাটির স্তর থাকায় সেতুর পিলার স্থাপনে সমস্যা, ২২টি পিলারের নতুন নকশা প্রণয়ন, নদীশাসনকাজে বিলম্ব এবং নদীভাঙন ও প্রবল স্রোত।

মূল সেতু ও নদীশাসনই হচ্ছে প্রকল্পের সবচেয়ে বড় কাজ। প্রকল্পের অগ্রগতি–সংক্রান্ত নথি অনুসারে, আগস্ট পর্যন্ত মূল সেতুর কাজ হয়েছে ৬৬ শতাংশ। অর্থাৎ প্রতি মাসে গড় অগ্রগতি ১ দশমিক ৪৩ শতাংশ। এই গতিতে এগোলে বাকি কাজ শেষ করতে অন্তত দুই বছর লাগবে। নদীশাসনের কাজের অগ্রগতি ৪২ দশমিক ৫ শতাংশ। প্রতি মাসে গড় অগ্রগতি ১ শতাংশের কম। এই গতিতে এগোলে কাজ শেষ হতে পাঁচ বছর সময় লেগে যেতে পারে।

সেতু বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রথম আলোকে বলেন, এখন পর্যন্ত মূল সেতুর ৪১টি পিলারের মধ্যে ১৪ টির কাজ শেষ। পিলারের ওপর ৫টি স্টিলের কাঠামো (স্প্যান) ইতিমধ্যে বসেছে। এখন সেতুর সাড়ে ৭০০ মিটার দৃশ্যমান। তবে আগামী তিন মাসের মধ্যে আর কোনো স্প্যান বসার সম্ভাবনা নেই। কারণ, পাইলিংয়ের জটিলতার কারণে ৭৫০ মিটারের সঙ্গে সংযোগ করার জন্য প্রয়োজনীয় পিলার বসানো যায়নি। সব মিলিয়ে এখন যে গতিতে কাজ চলছে, তাতে ২০২১ সালের আগে কাজটি শেষ হবে না।

জানতে চাইলে প্রকল্পের বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রধান জামিলুর রেজা চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, মূল সেতুর কাজ এক বছর ও নদীশাসনের দুই বছর সময় বেশি লাগতে পারে। সময় বৃদ্ধির ফলে এর প্রভাব ও ব্যয় বৃদ্ধির সম্ভাবনা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, যত দেরিতে সেতু চালু হবে, তত এর ব্যবহারের ফলে যে অর্থনৈতিক সুবিধা পাওয়ার কথা, তা পাওয়া যাবে না। আর জ্বালানি তেল, স্টিল, সিমেন্ট ও বৈদেশিক মুদ্রার মূল্য বৃদ্ধি পেলে ব্যয় বাড়তে পারে বলে তিনি জানান।

বক্তব্য জানার জন্য পদ্মা সেতু প্রকল্পের পরিচালক শফিকুল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।

সময় নিয়ে আলোচনা
পদ্মা সেতুর কারিগরি ও সার্বিক বিষয় নিয়ে আলোচনা করার জন্য জামিলুর রেজা চৌধুরীর নেতৃত্বে দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের নিয়ে আছে ‘প্যানেল অব এক্সপার্ট’। প্রকল্প এলাকায় গত রোববার থেকে গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত এই বিশেষজ্ঞ কমিটির বৈঠক হয়েছে। বছরে তিন-চারবার এই বৈঠক হয়ে থাকে। বৈঠকে উপস্থিত সূত্র জানায়, বাড়তি ২২টি পাইল বসানোর সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়েছে। এর মধ্যে ১১টি পাইলের চারপাশে কংক্রিটের বেড়ার মতো দেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া রেল ও পরিবহন চলাচলের জন্য যে ডেক বা পথ বসানোর কথা, সেটির কিছু কারিগরি ত্রুটি নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

বৈঠক সূত্র আরও জানায়, প্রকল্পের অগ্রগতি এবং কবে নাগাদ শেষ হতে পারে, সেটা নিয়েও বৈঠকে আলোচনা হয়। বর্তমানে মূল সেতুর কাজের অগ্রগতি প্রতি মাসে গড়ে ২ শতাংশের কম। অথচ শুরুতে আড়াই থেকে ৩ শতাংশ হারে অগ্রগতির পরিকল্পনা করা হয়েছিল। ঠিকাদারেরা এর জন্য নকশায় জটিলতাকে দায়ী করেন। বৈঠকে ২০২০ সালের মধ্যে পদ্মা সেতুর কাজ শেষ করার বিষয়ে তাগিদ দেওয়া হয়।

ব্যয় কেন আরও বাড়বে
সরকারের ক্রয়সংক্রান্ত আইনে বিশেষ কোনো অবস্থার সৃষ্টি না হলে দুবারের বেশি প্রকল্প প্রস্তাব সংশোধন করা যায় না। কিন্তু পরিকল্পনা কমিশন পদ্মা সেতু প্রকল্পের জন্য এই আইন শিথিল করার বিষয়ে একমত হয়েছে।

পদ্মা বহুমুখী সেতু বাস্তবায়নে ২০০৭ সালে একনেকে ১০ হাজার ১৬১ কোটি ৭৫ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদিত হয়। এরপর দুই দফা ব্যয় সংশোধন করা হয়। যেমন: ২০১১ সালে ব্যয় বাড়িয়ে করা হয় ২০ হাজার ৫০৭ কোটি ২০ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালে ২৮ হাজার ৭৯৩ কোটি টাকা। আর এখন জমি অধিগ্রহণের জন্য বাড়তি যুক্ত হয়েছে আরও ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা। ফলে এখন পর্যন্ত মোট ব্যয় দাঁড়াচ্ছে ৩০ হাজার ১৯৩ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মূল প্রকল্প প্রস্তাব থেকে ব্যয় বেড়েছে ২০ হাজার ৩১ কোটি ২৫ লাখ টাকা। আর আগস্ট পর্যন্ত ব্যয় হয়েছে ১৬ হাজার ৭৯৫ কোটি টাকা।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, সময় বৃদ্ধি ও প্রকল্প বাস্তবায়নের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজও বাড়তে পারে—এমন ধারণা কর্মকর্তাদের। এ ক্ষেত্রে ব্যয়ও বাড়তে পারে। সময় বৃদ্ধির ফলে অবধারিত ব্যয় বৃদ্ধি পাবে নির্মাণ-উপকরণ ও ডলারের মূল্য বৃদ্ধির কারণে। ২০১৪ সালে ঠিকাদারের সঙ্গে চুক্তি করার সময় ডলারের মূল্য ছিল ৭৮ টাকা। এখন তা ৮৪ টাকা হয়ে গেছে। উপকরণের মূল্য বৃদ্ধি বাবদ প্রকল্পের মোট ব্যয়ের মধ্যেই ৪০০ কোটি টাকা ধরা আছে। এর বেশি হলে মোট ব্যয়ও বাড়বে। এ ছাড়া অন্যদিকে কাজ বৃদ্ধির জন্যও প্রকল্পে ৪০০ কোটি টাকা রাখা আছে। কিন্তু নদীশাসনের জন্য তোলা বালু ফেলার জায়গা কেনায় ১ হাজার ৪০০ কোটি টাকা ব্যয় বেড়ে গেছে। এই কাজে আরও জমির প্রয়োজন হতে পারে বলে সূত্র জানিয়েছে।

সেতু বিভাগ সূত্র জানায়, এক বছর সময় বৃদ্ধির সরকারি সিদ্ধান্তে অখুশি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। কারণ, এর মধ্যে কাজ শেষ করা সম্ভব নয়। আর কাজ শেষ না হলে জরিমানা গুনতে হবে। তবে প্রকল্প কর্তৃপক্ষ তাদের আশ্বাস দিয়েছে, প্রয়োজনে আরও সময় বাড়ানো হবে। তবে একবারে নয়, সময়-সময়। তাতে খরচও অবশ্য বাড়বে।

এই বিষয়ে জানতে চাইলে সাবেক সচিব ও বৃহৎ প্রকল্প বিষয়ে বিশেষজ্ঞ মুহাম্মদ ফাওজুল কবির খান প্রথম আলোকে বলেন, প্রকল্পের মেয়াদ বাড়লে ব্যয় বাড়বেই। এ ছাড়া মেয়াদ বাড়ার কারণে নির্ধারিত সময়ের সেতুটি ব্যবহার করার সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে মানুষ। ফলে বিনিয়োগের বিপরীতে অর্থনৈতিক যে প্রাপ্তি শুরুতে ধরা হয়েছিল, তা কমে যাবে।

Facebook Comments

এ জাতীয় আরো খবর