আজঃ ২৭শে অগ্রহায়ণ ১৪২৫ - ১১ই ডিসেম্বর ২০১৮ - রাত ১১:১৩

জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া মানুষগুলোই প্রবীণ

Published: অক্টো ০১, ২০১৮ - ১০:১৭ অপরাহ্ণ

আহমাদ শামীম:জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া মানুষদের বলা হয় ‘প্রবীণ’। কিন্তু তারা আসলে কতটা প্রবীণ? অভিজ্ঞতা আর প্রজ্ঞার মিশেলে এই সময় বাংলাদেশের পটভূমিতে কখনও বড়ই হতাশার। আজ বিশ্ব প্রবীণ দিবস। দিবসটির প্রাক্কালে দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এই প্রবীণদের অবস্থা জানতে চেয়েছি আমরা।

আজ যারা নবীন, সময়ের প্রবাহে একদিন তারাই হবে প্রবীণ। প্রকৃতির অলঙ্ঘনীয় এই নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই মানুষের। অন্যভাবে যদি বলি, পৃথিবী চলছে তারুণ্যের শক্তির ওপর ভর করে। আর এই তারুণ্যকে পথ দেখায় প্রবীণ প্রজন্মের প্রজ্ঞা, মেধা আর অভিজ্ঞতা। নবীন আর প্রবীণের এই মেলবন্ধনেই এগিয়ে যায় সভ্যতা; সৃষ্টি হয় ইতিহাস।

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিরা প্রবীণ হিসেবে স্বীকৃত। প্রশ্ন হচ্ছে, বয়স দিয়ে কি ‘প্রবীণ’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করা যায়? ‘প্রবীণ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ- বহুদর্শী, প্রাচীন, বিজ্ঞ, পটু। তবে কিসের ভিত্তিতে শুধু বয়সের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ‘প্রবীণ’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করি? আপাতদৃষ্টিতে প্রবীণের সংজ্ঞা ভাব প্রকাশের জন্যই শুধু ব্যবহূত হোক- প্রবীণ দিবসের প্রাক্কালে এই আহ্বান রইল সবার প্রতি।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অমর সৃষ্টি ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র অন্যতম প্রধান চরিত্র ‘বুড়ো সান্তিয়াগো’র কথা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। এই উপন্যাসিকার একটি অমর লাইন হলো ‘মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু কখনও পরাজিত হয় না’। ‘বুড়ো সান্তিয়াগো’র এই উপলব্ধিই হয়তো পৃথিবীর তাবৎ প্রবীণের মনের কথা। বয়স বেড়ে গিয়ে মানুষের শেষ ঘনিয়ে আসতে পারে হয়তো, কিন্তু জীবনভর তার যে অর্জন, সেই অর্জনের কোনো সমাপ্তি নেই। বরং তা কালের খাতায় যোগ হয়ে সমৃদ্ধ করে তোলে আমাদের সময় ও সভ্যতা।

জীবনকে উপভোগ করে নির্ধারিত সময়ের শেষটুকু পর্যন্ত নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটাও কম কিসে! সমাজের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ‘প্রবীণ’। প্রবীণ বলেই তারা নতুন প্রজন্মের হাতে সঁপে দেন সব দায়িত্বের ভার। তাদের যদি প্রবীণ না বলে আমরা ‘অগ্রজ প্রজন্ম’ বলি, তাহলে হয়তো তাদের প্রতি আমাদের সমাজের যে বৈষম্য, সেটা কিছুটা হলেও ঘুচত।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে বিশ্বে প্রবীণ জনসংখ্যা ছিল ২০ কোটি ৫০ লাখ। ২০১২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮১ কোটিতে। ১৯৯০ সালে আমাদের দেশে প্রবীণ জনসংখ্যার হার ছিল মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১১ সালে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ হিসাবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২ লাখের বেশি। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি। ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৮০ লাখে। ২০৫০ সালের দিকে জনসংখ্যার ২০ শতাংশই হবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। গবেষকদের মতে, যে হারে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সালে প্রবীণ এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫ কোটিতে। অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রতি ৫ জনে একজন হবেন প্রবীণ। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ২ জন এবং প্রতি বছর ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ৬০ বছরে পদার্পণ করছেন।

দেশের মূল জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ যখন অগ্রজ প্রজন্মের মানুষ, তখন প্রশ্ন আসে, কেমন আছেন তারা? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যায়, ভালো নেই আমাদের অগ্রজ প্রজন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ এবং হেল্প এজ ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপের তথ্যমতে, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবীণ মানসিক নির্যাতন, ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ অবহেলা এবং ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের পরিবার ও সমাজে বোঝা হিসেবে দেখা হয়। যেসব পরিবার অর্থনৈতিক টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে যায়, যেসব পরিবারে মানবিক মূল্যবোধের অভাব  দেখা যায়, সেসব ক্ষেত্রে প্রবীণদের অবস্থা আরও করুণ।

দেশে প্রবীণদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা চোখে পড়ার মতো। তাদের কল্যাণে ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে প্রথম বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি চালু করা হয়। পরবর্তী সব নির্বাচিত সরকার এ জনবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহতও রাখে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় বর্তমানে ‘বয়স্ক ভাতা’ কর্মসূচি হচ্ছে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সের বেশি বয়স্ক অসচ্ছল ব্যক্তি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। দেশে মোট ৩৫ লাখের বেশি প্রবীণ এ ভাতা পাচ্ছেন বর্তমানে। ভাতার মোট পরিমাণ ২ হাজার ১০০ কোটি টাকারও বেশি। জাতীয় পর্যায়ে ‘প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩’, ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ প্রণয়ন করা হলেও দেখা যায় না এসব নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন। ২০১৪ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়নের মাধ্যমে ৬০ ও তদূর্ধ্ব নাগরিকদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই নীতিমালার অধীনে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও তার নেই কোনো বাস্তবায়ন।

পথেঘাটে চোখে পড়ে বিপুল ভিক্ষুক, যাদের অধিকাংশই প্রবীণ ও বৃদ্ধ। তাদের প্রায় অনেকেই ভিক্ষার থালা হাতে তুলে নিয়েছেন জীবিকার তাগিদে। এ ছাড়াও রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশায়ও প্রবীণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগই রাজধানীমুখী এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্র্রোত থামাতে পারছে না। অসচ্ছল প্রবীণদের মধ্যে যারা এখনও কিছুটা কর্মক্ষম তারা হয়তো কোনোভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন নিজেদের। কিন্তু দুস্থ ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলা অসচ্ছল প্রবীণদের জীবন আরও দুর্বিষহ। অর্থনৈতিক ও মূল্যবোধের অভাব যেসব পরিবারে, তাদের অনেকে বেঁচে থাকেন পরিবারের সদস্যদের দয়ার ওপর। কারও কারও কখনও স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় সেই বৃদ্ধাশ্রমও যে কতটা অপ্রতুল, তা আর পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানোর দরকার হয় না। বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটলে হয়তো প্রবীণ তথা অগ্রজ প্রজন্মের মানুষদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক প্রচার, সরকারি উদ্যোগ, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি আরও অনেক বেশি উদ্যোগের।

বাংলাদেশের প্রবীণদের দুঃখ-দুর্দশার কথা যখন আলোচনার অধিকাংশ জায়গাই নিয়ে নিচ্ছে তখন বহির্বিশ্বে তাকালে দেখতে পাই, দুঃসাধ্য অনেক কাজ করে এই প্রবীণরা বয়সকে স্রেফ একটি সংখ্যা বলেই গণ্য করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আর্নি এলি স্মিথের কথা। ৯৯ বছর বয়সে পাইলট হিসেবে আকাশে বিমান উড়িয়ে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। সবচেয়ে বেশি বয়সে পাইলট হওয়ার কারণে গিনেস রেকর্ডসে নাম উঠেছে তার। এ ছাড়াও ২০০৩ সালে ৭০ বছর বয়সে উইসিরো মিউরা মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে গিনেস রেকর্ডসে তুলে নিয়েছেন নিজের নাম। কিন্তু রেকর্ডটি যদি আবার কেউ দখলে নিয়ে নেয়, এই ভেবে ৭৫ বছর বয়সে আবারও চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে সেবার আর সফল হননি। থাইল্যান্ডের কিমলান জিনাকুল ৯১ বছর বয়সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে কম অবাক করেননি আমাদের। ১০০ বছর বয়সের জাপানি নারী মিয়েকো নাগায়োকা ১৫০০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতারে গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড। এসব খবর দেখে-শুনে ইচ্ছে হয়, কবে হবে আমাদের দেশে অগ্রজদের এমন দুর্লভ অর্জন!

‘রক্তে যখন ফুরোবে ওর খেলার নেশা খোঁজা/ তখনি কাজ অচল হবে, বয়স হবে বোঝা।/ ওগো তুমি কী করছ ভাই, স্তব্ধ সারাক্ষণ-/ বুদ্ধি তোমার আড়ষ্ট যে, ঝিমিয়ে-পড়া মন।/ নবীন বয়স যেই পেরোল খেলাঘরের দ্বারে,/ মরচে-পড়া লাগল তালা, বন্ধ একেবারে।/ ভালোমন্দ বিচারগুলো খোঁটায় যেন পোঁতা।/ আপন মনের তলায় তুমি তলিয়ে গেলে কোথা।/ চলার পথে আগল দিয়ে বসে আছ স্থির-/ বাইরে এসো, বাইরে এসো, পরমগম্ভীর।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রবীণ’ কবিতার মধ্য দিয়ে শেষ করি এই লেখা। অগ্রজ প্রজন্ম ভালো থাকুক। শুভ বোধ ও বুদ্ধির উদয় হোক আমাদের সবার মনে।

ছবি:এস এম আকবর আলী

Facebook Comments

আহমাদ শামীম:জীবনের শেষ প্রান্তে পৌঁছে যাওয়া মানুষদের বলা হয় ‘প্রবীণ’। কিন্তু তারা আসলে কতটা প্রবীণ? অভিজ্ঞতা আর প্রজ্ঞার মিশেলে এই সময় বাংলাদেশের পটভূমিতে কখনও বড়ই হতাশার। আজ বিশ্ব প্রবীণ দিবস। দিবসটির প্রাক্কালে দেশের জনসংখ্যার বড় একটি অংশ এই প্রবীণদের অবস্থা জানতে চেয়েছি আমরা।

আজ যারা নবীন, সময়ের প্রবাহে একদিন তারাই হবে প্রবীণ। প্রকৃতির অলঙ্ঘনীয় এই নিয়ম এড়িয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই মানুষের। অন্যভাবে যদি বলি, পৃথিবী চলছে তারুণ্যের শক্তির ওপর ভর করে। আর এই তারুণ্যকে পথ দেখায় প্রবীণ প্রজন্মের প্রজ্ঞা, মেধা আর অভিজ্ঞতা। নবীন আর প্রবীণের এই মেলবন্ধনেই এগিয়ে যায় সভ্যতা; সৃষ্টি হয় ইতিহাস।

জাতিসংঘের ঘোষণা অনুযায়ী, বাংলাদেশে ৬০ বছর এবং তদূর্ধ্ব বয়সী ব্যক্তিরা প্রবীণ হিসেবে স্বীকৃত। প্রশ্ন হচ্ছে, বয়স দিয়ে কি ‘প্রবীণ’ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করা যায়? ‘প্রবীণ’ শব্দটির আভিধানিক অর্থ- বহুদর্শী, প্রাচীন, বিজ্ঞ, পটু। তবে কিসের ভিত্তিতে শুধু বয়সের দৃষ্টিকোণ থেকে আমরা ‘প্রবীণ’-এর সংজ্ঞা নির্ধারণ করি? আপাতদৃষ্টিতে প্রবীণের সংজ্ঞা ভাব প্রকাশের জন্যই শুধু ব্যবহূত হোক- প্রবীণ দিবসের প্রাক্কালে এই আহ্বান রইল সবার প্রতি।

আর্নেস্ট হেমিংওয়ের অমর সৃষ্টি ‘ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সি’র অন্যতম প্রধান চরিত্র ‘বুড়ো সান্তিয়াগো’র কথা আমরা কম-বেশি সবাই জানি। এই উপন্যাসিকার একটি অমর লাইন হলো ‘মানুষ ধ্বংস হয়ে যেতে পারে কিন্তু কখনও পরাজিত হয় না’। ‘বুড়ো সান্তিয়াগো’র এই উপলব্ধিই হয়তো পৃথিবীর তাবৎ প্রবীণের মনের কথা। বয়স বেড়ে গিয়ে মানুষের শেষ ঘনিয়ে আসতে পারে হয়তো, কিন্তু জীবনভর তার যে অর্জন, সেই অর্জনের কোনো সমাপ্তি নেই। বরং তা কালের খাতায় যোগ হয়ে সমৃদ্ধ করে তোলে আমাদের সময় ও সভ্যতা।

জীবনকে উপভোগ করে নির্ধারিত সময়ের শেষটুকু পর্যন্ত নিজেকে বাঁচিয়ে রাখাটাও কম কিসে! সমাজের বিশাল একটি জনগোষ্ঠী ‘প্রবীণ’। প্রবীণ বলেই তারা নতুন প্রজন্মের হাতে সঁপে দেন সব দায়িত্বের ভার। তাদের যদি প্রবীণ না বলে আমরা ‘অগ্রজ প্রজন্ম’ বলি, তাহলে হয়তো তাদের প্রতি আমাদের সমাজের যে বৈষম্য, সেটা কিছুটা হলেও ঘুচত।

জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংগঠনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৯৫০ সালে বিশ্বে প্রবীণ জনসংখ্যা ছিল ২০ কোটি ৫০ লাখ। ২০১২ সালে এ সংখ্যা দাঁড়ায় প্রায় ৮১ কোটিতে। ১৯৯০ সালে আমাদের দেশে প্রবীণ জনসংখ্যার হার ছিল মোট জনসংখ্যার ৪ দশমিক ৯৮ শতাংশ। ২০০১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী তা বৃদ্ধি পেয়ে ৬ দশমিক ১ শতাংশে দাঁড়ায়। ২০১১ সালে দেশের জনসংখ্যা ১৫ কোটি ২৫ লাখ হিসাবে প্রবীণ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়ায় ১ কোটি ২ লাখের বেশি। বর্তমানে এ সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ কোটি ৪০ লাখের বেশি। ২০২৫ সাল নাগাদ এ সংখ্যা দাঁড়াবে ১ কোটি ৮০ লাখে। ২০৫০ সালের দিকে জনসংখ্যার ২০ শতাংশই হবে প্রবীণ জনগোষ্ঠী। গবেষকদের মতে, যে হারে প্রবীণদের সংখ্যা বাড়ছে, তাতে ২০৫০ সালে প্রবীণ এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৫ কোটিতে। অর্থাৎ জনসংখ্যার প্রতি ৫ জনে একজন হবেন প্রবীণ। বর্তমানে বিশ্বে প্রতি সেকেন্ডে ২ জন এবং প্রতি বছর ৫ কোটি ৮০ লাখ মানুষ ৬০ বছরে পদার্পণ করছেন।

দেশের মূল জনগোষ্ঠীর বিরাট একটি অংশ যখন অগ্রজ প্রজন্মের মানুষ, তখন প্রশ্ন আসে, কেমন আছেন তারা? বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থা বিবেচনায় দেখা যায়, ভালো নেই আমাদের অগ্রজ প্রজন্ম। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পপুলেশন সায়েন্স বিভাগ এবং হেল্প এজ ইন্টারন্যাশনাল কর্তৃক পরিচালিত এক জরিপের তথ্যমতে, দেশের ৮৮ দশমিক ৪ শতাংশ প্রবীণ মানসিক নির্যাতন, ৮৩ দশমিক ৩ শতাংশ অবহেলা এবং ৫৪ দশমিক ৪ শতাংশ অর্থনৈতিক প্রবঞ্চনার শিকার হচ্ছেন। অনেক ক্ষেত্রে প্রবীণদের পরিবার ও সমাজে বোঝা হিসেবে দেখা হয়। যেসব পরিবার অর্থনৈতিক টানাপড়েনের ভেতর দিয়ে যায়, যেসব পরিবারে মানবিক মূল্যবোধের অভাব  দেখা যায়, সেসব ক্ষেত্রে প্রবীণদের অবস্থা আরও করুণ।

দেশে প্রবীণদের জন্য সরকারি বা বেসরকারি সুযোগ-সুবিধার অপ্রতুলতা চোখে পড়ার মতো। তাদের কল্যাণে ১৯৯৬-৯৭ অর্থবছরে প্রথম বয়স্ক ভাতা কর্মসূচি চালু করা হয়। পরবর্তী সব নির্বাচিত সরকার এ জনবান্ধব কর্মসূচি অব্যাহতও রাখে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে সামাজিক নিরাপত্তা বলয়ের আওতায় বর্তমানে ‘বয়স্ক ভাতা’ কর্মসূচি হচ্ছে সবচেয়ে বড় কর্মসূচি। বর্তমানে ৬৫ বছর বয়সের বেশি বয়স্ক অসচ্ছল ব্যক্তি মাসিক ৫০০ টাকা হারে ভাতা পেয়ে থাকেন। দেশে মোট ৩৫ লাখের বেশি প্রবীণ এ ভাতা পাচ্ছেন বর্তমানে। ভাতার মোট পরিমাণ ২ হাজার ১০০ কোটি টাকারও বেশি। জাতীয় পর্যায়ে ‘প্রবীণ নীতিমালা-২০১৩’, ‘পিতামাতার ভরণপোষণ আইন-২০১৩’ প্রণয়ন করা হলেও দেখা যায় না এসব নীতিমালার যথাযথ বাস্তবায়ন। ২০১৪ সালে ‘জাতীয় প্রবীণ নীতিমালা’ প্রণয়নের মাধ্যমে ৬০ ও তদূর্ধ্ব নাগরিকদের ‘সিনিয়র সিটিজেন’ হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়। এই নীতিমালার অধীনে বেশ কয়েকটি সিদ্ধান্ত গৃহীত হলেও তার নেই কোনো বাস্তবায়ন।

পথেঘাটে চোখে পড়ে বিপুল ভিক্ষুক, যাদের অধিকাংশই প্রবীণ ও বৃদ্ধ। তাদের প্রায় অনেকেই ভিক্ষার থালা হাতে তুলে নিয়েছেন জীবিকার তাগিদে। এ ছাড়াও রিকশাচালক, নির্মাণ শ্রমিকসহ বিভিন্ন পেশায়ও প্রবীণদের উপস্থিতি চোখে পড়ার মতো। সরকারি-বেসরকারি কোনো উদ্যোগই রাজধানীমুখী এই প্রবীণ জনগোষ্ঠীর স্র্রোত থামাতে পারছে না। অসচ্ছল প্রবীণদের মধ্যে যারা এখনও কিছুটা কর্মক্ষম তারা হয়তো কোনোভাবে চালিয়ে নিয়ে যেতে পারছেন নিজেদের। কিন্তু দুস্থ ও কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলা অসচ্ছল প্রবীণদের জীবন আরও দুর্বিষহ। অর্থনৈতিক ও মূল্যবোধের অভাব যেসব পরিবারে, তাদের অনেকে বেঁচে থাকেন পরিবারের সদস্যদের দয়ার ওপর। কারও কারও কখনও স্থান হয় বৃদ্ধাশ্রমে। প্রবীণ জনগোষ্ঠীর তুলনায় সেই বৃদ্ধাশ্রমও যে কতটা অপ্রতুল, তা আর পরিসংখ্যান দিয়ে বোঝানোর দরকার হয় না। বাংলাদেশের সামাজিক অবস্থার উন্নয়ন ঘটলে হয়তো প্রবীণ তথা অগ্রজ প্রজন্মের মানুষদের কষ্ট কিছুটা লাঘব হবে। এ জন্য প্রয়োজন ব্যাপক সামাজিক প্রচার, সরকারি উদ্যোগ, আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন এবং বেসরকারি আরও অনেক বেশি উদ্যোগের।

বাংলাদেশের প্রবীণদের দুঃখ-দুর্দশার কথা যখন আলোচনার অধিকাংশ জায়গাই নিয়ে নিচ্ছে তখন বহির্বিশ্বে তাকালে দেখতে পাই, দুঃসাধ্য অনেক কাজ করে এই প্রবীণরা বয়সকে স্রেফ একটি সংখ্যা বলেই গণ্য করেন। উদাহরণ হিসেবে বলা যায় আর্নি এলি স্মিথের কথা। ৯৯ বছর বয়সে পাইলট হিসেবে আকাশে বিমান উড়িয়ে তিনি তাক লাগিয়ে দিয়েছেন সবাইকে। সবচেয়ে বেশি বয়সে পাইলট হওয়ার কারণে গিনেস রেকর্ডসে নাম উঠেছে তার। এ ছাড়াও ২০০৩ সালে ৭০ বছর বয়সে উইসিরো মিউরা মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে গিনেস রেকর্ডসে তুলে নিয়েছেন নিজের নাম। কিন্তু রেকর্ডটি যদি আবার কেউ দখলে নিয়ে নেয়, এই ভেবে ৭৫ বছর বয়সে আবারও চেষ্টা চালিয়েছিলেন। তবে সেবার আর সফল হননি। থাইল্যান্ডের কিমলান জিনাকুল ৯১ বছর বয়সে স্নাতক ডিগ্রি লাভ করে কম অবাক করেননি আমাদের। ১০০ বছর বয়সের জাপানি নারী মিয়েকো নাগায়োকা ১৫০০ মিটার ফ্রি স্টাইল সাঁতারে গড়েছেন বিশ্বরেকর্ড। এসব খবর দেখে-শুনে ইচ্ছে হয়, কবে হবে আমাদের দেশে অগ্রজদের এমন দুর্লভ অর্জন!

‘রক্তে যখন ফুরোবে ওর খেলার নেশা খোঁজা/ তখনি কাজ অচল হবে, বয়স হবে বোঝা।/ ওগো তুমি কী করছ ভাই, স্তব্ধ সারাক্ষণ-/ বুদ্ধি তোমার আড়ষ্ট যে, ঝিমিয়ে-পড়া মন।/ নবীন বয়স যেই পেরোল খেলাঘরের দ্বারে,/ মরচে-পড়া লাগল তালা, বন্ধ একেবারে।/ ভালোমন্দ বিচারগুলো খোঁটায় যেন পোঁতা।/ আপন মনের তলায় তুমি তলিয়ে গেলে কোথা।/ চলার পথে আগল দিয়ে বসে আছ স্থির-/ বাইরে এসো, বাইরে এসো, পরমগম্ভীর।’ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘প্রবীণ’ কবিতার মধ্য দিয়ে শেষ করি এই লেখা। অগ্রজ প্রজন্ম ভালো থাকুক। শুভ বোধ ও বুদ্ধির উদয় হোক আমাদের সবার মনে।

ছবি:এস এম আকবর আলী

Facebook Comments

এ জাতীয় আরো খবর